অন্যকে জানাতে পারেন:

che guevara
চে গুয়েভারা। ছবি: সংগৃহীত

আবদুল্লাহ মাহফুজ


বলিভিয়া ল্যাতিন আমেরিকার এক দেশ। আর বিএম কলেজ বাংলাদেশের বরিশাল শহরের একটি বিদ্যাপীঠ।

৫০ বছর আগের বলিভিয়ার এক জঙ্গলে বিপ্লবের কিংবদন্তী পুরুষ চে গুয়েভারা আটক হন এমন এক অক্টোবর মাসে। তার বিপ্লবের প্রচেষ্টা আদর্শ থামিয়ে দিতে তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। মূলত মৃত্যুর পরপরই চে গুয়েভারা বিশ্ব ইতিহাসের মহানায়কে রুপান্তর হন। তাকে থামিয়ে রাখা যায়নি। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, অন্যায় প্রতিবাদ প্রতিরোধ সারা বিশ্বেই বিপ্লবীদের কাছে চে গুয়েভারা হয়ে ওঠেন প্রেরণা। বিশেষ করে দেশে দেশে দলে দলে তরুণদের আকৃষ্ট করেছে প্রেরণা জুগিয়েছে চে গুয়েভারার ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তির আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরার সাহস। 

বলিভিয়ার জঙ্গল থেকে এবার আসি আমরা বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। ১৯৬৭ সাল থেকে আমরা চলে আসি ২০১১ সালের একটি ঘটনায়। বিএম কলেজে তখন প্রগতিশীল শিক্ষার্থীরা বেশ কিছু সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো। শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনের ফলে দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিমুখ এবং সন্ত্রাসী-বখাটেদের একচ্ছত্র আধিপাত্যে ভাটা পরে। এই আন্দোলনের অগ্রভাগের নেতা-কর্মীরা ছিলো ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের চক্ষুশূল। যদিও প্রগতীশীল ছাত্র সংগঠন হিসেবে দাবিদার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তখন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আন্দোলনে মৌখিকভাবে যুক্ত থাকতো। কিন্তু আসলে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবেই নিয়েছিলো আন্দোলনকারীদের। তাই বিভিন্ন সময়েই বাধা আসতো আন্দোলন কার্যক্রমে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন গ্রুপ থেকে।

এমনই একটি বাধা আসে চে গুয়েভারার একটি গ্রাফিতি আঁকতে গিয়ে। তখন আমি বিএম কলেজের ছাত্র ও বরিশালে একটি স্থানীয় সংবাদ পত্রে কাজ করি। এক রাতে আমরা কয়েকজন কর্মী সংগঠকরা উদ্যোগ নিলাম চে গুয়েভারার একটি গ্রাফিতি করার। গ্রাফিতির নিচে তার একটি উক্তি থাকবে। ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনের পেছনে মুক্তমঞ্চের পাশে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের দেয়ালে চে গুয়েভারার ছবি আঁকার স্থান নির্ধারন করা হলো। রঙ-তুলি দিয়ে রাত ৮টার দিকে শুরু হলো কাজ। রাতে পত্রিকা অফিসে কাজ করছি এমন সময় আঁকিয়ে বন্ধুরা ফোন দিয়ে জানালো ছাত্র লীগের এক নেতা এসে হুমকি দিয়ে গেছে চে গুয়েভারার ছবি না আঁকার জন্য।

 বিএম কলেজ, বরিশাল

তখন মাত্র মুখোবয়ব আঁকা হয়েছিলো। কিন্তু কিছুতেই তারা এই ছবি আঁকতে দিবে না। বরিশালের এক স্বনাম ধন্য কমিউনিষ্ট নেতার ছেলে তখন বিএম কলেজের ছাত্রলীগ নেতা। যদিও তার ছাত্রত্ব বহু আগেই শেষে হয়ে গেছে। সেই নেতার নেতৃত্বে একটি বড় দল মহরা দিয়ে এসে ছবি আঁকা বন্ধ করার জন্য হুমকি দেয়। আমার সাথেও ফোনে বাকবিতণ্ডতায় জড়িয়ে সেই নেতা বলেছিলো- ‘এখানে আঁকা হলে একমাত্র বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকতে হবে।’ 

ঘটনার কিছুক্ষণ পর সহযোদ্ধা-বন্ধুদের আবারো ফোন এলো চে’র ছবি আঁকা হলে ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন উদ্যাক্তাদের মধ্যে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কয়েক সংগঠক সিদ্ধান্ত নেয় সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এড়াতে আপাতত ছবি আঁকা বন্ধ থাকুক। 

রাত সাড়ে ৯টার দিকে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেখলাম যে মুখয়বয়বের স্ট্রাকচার আঁকা হয়েছিলো মাত্র তাও সাদা চুনে ঢেকে দিতে হয়েছিলো। কিন্তু সেই চুনা রঙের আড়াল থেকেই দেখা যাচ্ছিলো চে গুয়েভারার মুখাকৃতি। এ যেন আরেক বলিভিয়ার গল্প। যেখানে চে গুয়েভারাকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা নিয়েই হত্যা করা হয়েছিলো। এতো বছর পর সেই দৃশ্য যেন ভিন্ন ‍রুপে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আমরা আবার দেখতে পেয়েছিলাম। 

 বিএম কলেজ, বরিশাল

গত ৯ অক্টোবর বিশ্ব জুড়ে নানা আয়োজনে পালিত হলো চে গুয়েভরার ৫০তম মৃত্যু বার্ষিকী। ওই আয়োজন ঘিরে ল্যাতিন আমেরিকা থেকে দেশে দেশে যেমন ছিলো চে গুয়েভারার আর্দশে উজ্জেবিত হয়ে শোষন মুক্তি সমাজ গড়ার  প্রতিজ্ঞা তেমনি আবার চে গুয়েভারার মৃত্যু গল্প নিয়ে কেউ কেউ প্রপাগান্ডা মূলক সংবাদও পরিবেশন করেছেন। ওয়াশিংটন পোষ্টে তেমনই এক খবর বেরিয়েছিলো সিআইএর এজেন্ট ফেলিস্ক রদ্রিগেজের বরাত দিয়ে । সেখানে বলা হয় মৃত্যুর আগে চে আকুতি করে বলেছে ‘আমাকে গুলি কোরো না।’  অথচ এ সংক্রান্ত  তথ্য এবারই প্রথম শোনা গেলো মৃত্যুকে বীরত্বের সাথে বরন করা চে গুয়েভারা সম্পর্কে। 

এমন নানা প্রপাগান্ডা কিউবার বিপ্লবীদের নিয়ে যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। তবে আদৌ কি এই গল্প বিশ্বাস থামিয়ে দেয়া গিয়েছে। যেমন করে বিএম কলেজ ক্যাম্পাসে তরুণরা এখনো মিছিল করে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার কথা বলে। ‘চে’র ছবি বুকে নিয়ে স্লোগানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিএম কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে তারা দাবি তোলে। ছাত্র অধিকার আদায়ের কথা বলে। অযাচিত তকমাধারী ছাত্র নেতা নয় ছাত্ররা তাদের প্রতিনিধি চায়। কিন্তু কতৃপক্ষ ছাত্রদের হাতে তাদের অধিকার দিতে নারাজ। আর তাইতো খবরদারী চলে ক্ষমতার বলয়ে ছাত্র নেতা নাম নিয়ে। যাদের সাথে সাধারণ ছাত্রদের আবেগ চাওয়া পাওয়ার কোন যোগ সাজস নেই।

 বিএম কলেজ, বরিশাল

যে চে গুয়েভারাকে এই তরুণ শিক্ষার্থীরা তাদের আদর্শের নায়ক বলে দাবি করেন তারা নিশ্চই শেষ পর্যন্ত নিভে যাবেন না, যেমন নেভানো যায়নি চে গুয়েভারাকে। হয়তো সত্য তার মতো করে লড়ে যাবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রুপে বিভিন্ন নামে। যেমন করে চে গুয়েভারার বীরত্ব বলিভিয়া জঙ্গল থেকে পৌঁছে যায় বিএম কলেজে প্রেরণা হয়ে। যে জীবনে মানবিক বোধ এসে দোলা দিয়ে যায় সে জীবন মানেইতো মাথা নত না করা।

লেখক: সাংবাদিক, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগঠক।

আপনার মন্তব্য