অন্যকে জানাতে পারেন:

ছবি: সংগৃহীত

মওদুদ রহমান


সরকার প্রণীত পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (পিএসএমপি)-২০১৬ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি নির্ধারণী নির্দেশনার সর্বশেষ সংস্করণ। সাত বছর আগে প্রকাশিত পিএসএমপি-২০১০ এর তুলনায় বর্তমান পিএসএমপি’র আলোচনা ব্যাপক ও বিস্তৃত। আগাগোড়া জাপানী বিশেষজ্ঞ আর কোম্পানীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় প্রণীত হলেও এই দলিল বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের তাগিদ প্রকাশে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সেই উন্নতীর শিখরে পৌঁছাতে পিএসএমপি-২০১৬ এ যে পথ নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে তা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। অপরদিকে ভারত সরকার কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত ভারতের ন্যাশনাল ইলেক্টিসিটি প্ল্যান (এনইপি) তুলনামূলক বিচারে সমৃদ্ধ।

পিএসএমপি-২০১৬’তে বর্তমান মাথাপিছু মাত্র ৩০০ কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ ব্যবহারের হারকে যৌক্তিক ভাবেই ২০৪১ সালের মধ্যে ১৫০০ কিলোওয়াট আওয়ার উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে উপায় বর্ণনা করা হয়েছে তাতে করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহক পর্যায়ে যোগান দিতে ইউনিট প্রতি মূল্য ২০৩১ সাল পর্যন্ত বছর প্রতি ১০.৭ শতাংশ হারে এবং এর পরবর্তী বছরগুলোতে ৯.৫ শতাংশ হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে (দেখুন পিএসএমপি ২০১৬, পৃষ্ঠাঃ ৮৮৮, ১০৮৫)। ২০৪১ সালের মধ্যেই ১৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। তবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে স্থান নির্ধারণ প্রক্রিয়া, পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, কয়লার মান নির্দিষ্ট করণ, দূষণ মনিটিরিং ব্যবস্থা প্রণয়নের মত অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলোর আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ ভারতের এনইপি’র খসড়ায় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে নিঃসরণ মান বেঁধে দেয়া হয়েছে, পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরোপ করা হয়েছে কড়াকড়ি। সেই সাথে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ভারতে আর নতুন কোন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র না করার সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে (দেখুন এনইপি, পৃষ্ঠা ৫.৩৬, ১২.৮)। এর বিপরীতে সেখানে বাঁধভিত্তিক জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যতীরেকেই ২০২২ সালের মধ্যে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার নবায়নযোগ্য জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৩০ শতাংশ যা আরও বৃদ্ধি করে ২০৩০ সালের মধ্যেই ভারতের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ ‘সবুজ জ্বালানী’ হতে আহরণের ঘোষণা এসেছে (<http://powermin.nic.in/en/content/power-sector-glance-all-india><https:/...)।

বিপরীতে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৫ শতাংশ। আর পিএসএমপি ২০১৬’র ১-৬১ পাতায় বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানী হতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সর্বোচ্চ সম্ভাব্যতা দেখানো হয়েছে, হিসাব করলে তা দাঁড়ায় ২০৪১ সালে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার (২ লক্ষ ৩৬ হাজার গিগাওয়াট আওয়ার) মাত্র ৩ শতাংশ!

একই রিপোর্টের ১৩-১ পাতায় সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির দাম ইউনিট প্রতি ৫০ শতাংশ এবং বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির দাম ইউনিট প্রতি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হলেও সৌর এবং বায়ু ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোন বড় লক্ষ্য নির্ধারণ না করে বরং নবায়ন যোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক উৎপাদনকে আমদানী করা বিদ্যুতের পরিপূরক হিসাবে হাজির করা হয়েছে। অর্থাৎ পিএসএমপি-২০১৬’এ উল্লেখিত ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নবায়নযোগ্য জ্বালানী অথবা আমদানী করা বিদ্যুৎ যে কোন একটি দিয়ে পূরণ করার সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে (দেখুন পিএসএমপি -২০১৬, পৃষ্ঠা ১১-৬২)। অবস্থাদৃষ্টে বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেননা ২০১৫ সাল থেকেই বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানী ব্যবহারে দৃশ্যপট দ্রুত পালটে যেতে শুরু করে। ঐ বছরই চীনে কয়লা আমদানী ৩০ শতাংশ কমে যায়, ২০১৬ সালে তা আরও কমে। আর ২০১৭ তে এসে নতুন নীতির আলোকে সেখানে নির্মাণাধীন বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা ১ লক্ষ ২০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ১০৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় <https://www.nytimes.com/2017/01/18/world/asia/china-coal-power-plants-po... তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ভারতের জ্বালানী ব্যবহারের পরিবর্তন। সেখানে যে কেবলমাত্র সৌরশক্তির ব্যবহারই বেড়েছে তাই নয়, বরং এই ব্যবহারের খরচ এতটাই কমে গেছে যে তা কয়লা বিদ্যুতের সাথে পাল্লা দিচ্ছে এবং ইউনিট প্রতি সৌর বিদ্যুৎ খরচ বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ টাকায় নেমে গেছে <http://economictimes.indiatimes.com/industry/energy/power/solar-power-ta...

অপরদিকে বাংলাদেশে কয়লা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে যথাক্রমে ৩৫% ও ১০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৪১ সালের মধ্যেই যথাক্রমে ১৯ হাজার এবং ৭ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে (দেখুন পিএসএমপি-২০১৬, পৃষ্ঠা ১১-৩৩, ১১-৩৪)। অথচ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা এবং পারমাণবিক কেন্দ্রের ক্ষমতা নির্ধারণী একক-ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টরের আদর্শ মান (যথাক্রমে ৮৫% ও ৯০%) বিবেচনায় নিয়ে দেখা যায় যে, ৩৫% এবং ১০% বিদ্যুতের যোগান দিতে যথাক্রমে ১২ হাজার এবং ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রয়োজন। হাজার কোটি টাকা মূল্যমানের এমন সব বাড়তি প্রকল্পের প্রস্তাব সামান্য ভুল হিসেবে এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই।  

বাংলাদেশ সরকার প্রণীত পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান’এর ত্রুটিগুলো জরুরী ভিত্তিতে বিবেচনায় নিয়ে সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে হাঁটতে এই মহাপরিকল্পনার মৌলিক পরিবর্তন ও সংশোধন প্রয়োজন। নতুবা পিএসএমপি’র ভুল নিশানায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত পৌঁছে যাবে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ উৎপাদনী ফাঁদের কিনারায়।

লেখক: প্রকৌশলী ও গবেষক
(mowdudur@gmail.com)

আপনার মন্তব্য