চে গুয়েভারা। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

আর্নেস্তা চে গুয়েভারা। এই নামটি উচ্চারিত হলেই তার পরিচয় বিস্তারিত না বললেও চলবে। বিশ্ব জুড়ে এই বিপ্লবী অসীম সাহসী এক মানবতার যোদ্ধা হিসেবেই পরিচিত। একটি বৈষম্যহীন পৃথিবীর গড়ার জন্যেই লড়াই করতে করতে তিনি প্রাণ দিয়েছেন। বিলাসী জীবন যাপনের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকা সত্বেও অস্ত্র হাতে যিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন বনে জঙ্গলে সেই চে গুয়েভারা মানুষটি ভেতরে ভেতরে কম রোমান্টিক ছিলেন না। 

মার্কিন এজেন্ট সিআইএর কাছে যে মানুষটি ছিলেন চতুর কৌশলী মূর্তিমান আতঙ্কের এক যোদ্ধা সেই মানুষটিই আবার ছিলেন প্রেমিক-কবি! তার বিপ্লবী চরিত্রটি যেমন ছিলো নায়কোচিত বীরত্বে ভরা, তেমনি তার চেহারা গঠন, শৈল্পিক মুখাকৃতি আর সুঠাম দেহী মানুষটি সবার নজর কাড়ত।

ছোট বেলা থেকেই কবিতা পড়তে পছন্দ করতে চে গুয়েভারা। নিজেও লিখতেন কবিতা। ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম-ভালোবাসার বন্ধনেও আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তার জীবন ইতিহাস থেকে জানা যায় কৈশর তারুণ্যে তার জীবনে প্রেম এসেছিলো। কিউবা বিপ্লবের সময়েও এক সহযোদ্ধার সাথে গড়ে ওঠে তার প্রেমের সম্পর্ক। যদিও ব্যক্তিগত জীবনের এই প্রেম মায়া ভালোবাসার সম্পর্ক কোনটিই তার বিপ্লবী জীবনের লক্ষ্য থেকে সরিয়ে আনতে পারেনি। 

নিজেকে মানুষের জন্য উৎসর্গ করা চে’র ব্যক্তিগত জীবনে ছিলো কবিতার মতো প্রেম ও কবিতার সাথে প্রেম। চে গুয়েভারা কবিতা ভালোবাসতেন। তিনি কবিতা লিখেছেন। চে-র প্রিয় কবি ছিলেন স্পেনীয় রিপাবলিকান ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, আমেত্মানিও মাচাদো, রাফায়েল আলবের্তি, পাবলো নেরুদা প্রমুখ। স্পেনীয়, কিন্তু মেক্সিকোতে নির্বাসিত কবি লেওন ফিলিপের কবিতার বই থাকত তাঁর বালিশের নিচে।  পরে পাবলো নেরুদাকে লেখা এক চিঠিতে চে লিখেছিলেন, ‘আমি একজন ব্যর্থ কবি।’

তবে চের আর্কষনীয় ব্যক্তিত্ব সহজেই আকৃষ্ট করতো অন্যদের। যার কারণে অনেক মেয়েই সেই তরুণ বয়সে চে গুয়েভারার প্রেমে হাবুডবু খেয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে কেউ বা আবার গোপনে। চের সহপাঠী মিরিয়াম উরুশিয়ে মার্কিন সাংবাদিক জন লি এন্ডারসনের কাছে এক স্বাক্ষাতকারে বলেন, ১৭ বছর বয়সে আমরা তরুণীরা কম বেশি সবাই আর্নেস্তোর প্রেমে পড়েছিলাম। এর কারণ হতে পারে তার আর্কষনীয় চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত ও সহজ করে কথা বলার ধরন...।

ওই সময় চে গুয়েভারার সাথে এক অভিজাত বংশের তরুণীর সাথে প্রেম হয়। তবে এই প্রেমিক চে কখনো অন্ধ ছিলেন না প্রেমের মোহে। স্মৃতি কথায় সে বিষয়টিই গর্বের সাথে জানিয়েছিলো তার বন্ধু রিগ্যাতুসো। সেই স্মৃতি কথা বলতে গিয়েই উঠে আসে ১৭ বছর বয়সে চে গুয়েভারার প্রেমের কথা।

অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র থাকায় রিগ্যাতুসোকে সে বয়সে ফেরি করে মিষ্টি বিক্রি করে চলতে হতো। রিগ্যাতুসো বলেন, ‘একদিন চে তার প্রেমিকাকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলো। তখন পথে আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করে। কথা বলে। অভিজাত পরিবারের সেই মেয়েটি তখন একা দাঁড়িয়ে ছিলো। সাধারনত এই বয়সী কিশোর-তরুণেরা অভিজাত প্রেমিকা নিয়ে বের হলে এ ধরনের বন্ধুদের এড়িয়ে চলতো। আর্নেস্ত তা করেনি।’

চে’ গুয়েভারার জীবনে পরবর্তী প্রেম আসে গুয়েতমালায় অবস্থানকালে রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে যাবার পর। ইন্ডিয়ান ও চাইনিজ মিশ্রবংশোদ্ভুত পেরুভিয়ান অর্থনীতিবিদ হিলদাও রাজনৈতিক নির্বাসিত ছিলেন। হিলদার সাথে পরিচয় হওয়ার পর সে পরিচয় পরিনয়ে পরিনত হয়। পরবর্তীতে তারা বিয়ে করেন। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে অতোটা সময় দিতে পারেননি চে গুয়েভারা। বিপ্লবের মাঠেই কেটেছে তার সময়। কিউবা বিপ্লবের সময়েই চে-হিলদার পরিবারে প্রথম কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। যদিও চের এই দাম্পত্য জীবন শেষ পর্যন্ত টিকেনি। দুজনেই বন্ধুত্বপূর্ণভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটনা।

চে’র জীবনে আবারও প্রেম আসে। ওই প্রেম হয় কিউবা বিপ্লবের সময়। কিউবান গেরিলা দলের সদস্য অ্যালাইদা মার্চের সাথে গড়ে ওঠা এই প্রেমকে চে’র জীবনের সেরা প্রেম বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন সাংবাদিকজন লি এন্ডারসন। দীর্ঘ গবেষণার পর চে গুয়েভারা জীবন নিয়ে লেখা বইতে সে কথা উল্লেখ করেন তিনি। 
সেখানে জানা যায়, কিউবার সান্তা ক্লারা শহরের বাসিন্দা অ্যালাইদা মার্চ বাতিস্তা সরকারের স্বৈরশাষনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বেশ নাটকীয়ভাবে তাদের পরিচয় হয়।

সেই পরিচয় পর্বের স্মৃতি হাতরে অ্যালাইদা বলেন, ‘রাতে ঘুম না আসায় সকালে হাঁটতে বের হয়েছিলাম রাস্তায়। তখনই সেই পথে চে গুয়েভারা জিপটি এসে থামে। আল্যাইদার সাথে চে’র কথাপোকথন হয় তখন। সেই সময়ে চে একটি অভিযানে যাচ্ছিলেন তার গেরিলা বাহিনীকে নিয়ে। আল্যাইদার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে চে প্রস্তাব দেন- ‘ঘুম না আসলে আমাদের সাথে গেরিলা অপরেশনে যেতে পারো’। সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই’।

তিনি বলেন, ‘সেই থেকে সম্পর্কের শুরু । এরপর আমি আর তার সঙ্গ ছাড়িনি। তার পাশ ছেড়ে যাইনি কোথাও।’

সেই প্রেম প্রণয় থেকেই পরবর্তীতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন চে আর অ্যালাইদা। রাজনৈতিক ভাবেও অ্যালাইদা চে’র ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন।

যদিও বিপ্লবের নেশায় চে কোথাও স্থির হননি। ঘুরে বেড়িয়েছেন আফ্রিকা ল্যাতিন আমেরিকার পথে পথে। সর্ব শেষ বিপ্লব করতে যা বলিভিয়ায়। উরুগুয়ের ব্যবসায়ী সেজে ছদ্মবেশে তিনি বলিভিয়ায় যান। কথিত আছে এসময় তানিয়া নামে এক তরুণীকে তার প্রেমিকা বলা হতো। যদিও পুরো যাত্রাটি ছিলো ছদ্মবেশি, সে কারণেই তার সাথে চে’র সম্পর্কটাকে বলা হতো ছদ্মবেশ ধারনের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি আসলে প্রেমের সম্পর্ক না। তবে কেউ কেউ বলে থাকেন তানিয়ার সাথে তার প্রেম ছিলো। এ সম্পর্কটি রহস্যময় ভাবেই শেষ হয়। কারণ বলিভিয়ায় চে আটক হন। সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়।

আপনার মন্তব্য