অন্যকে জানাতে পারেন:

ছবি: সংগৃহীত

বদরুদ্দীন উমর


বাংলাদেশে এখন সুপ্রিমকোর্ট ও সরকারের মধ্যে সংকটজনক বিরোধ কমে আসার পরিবর্তে তীব্রতর হচ্ছে। এটা যে শুধু শাসক শ্রেণীর জন্যই বিপজ্জনক তা-ই নয়, যারা দেশের আমূল পরিবর্তন চান, বিপ্লব চান, সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেন, তাদের জন্যও বিপজ্জনক।

কাজেই এই সংকটের নিরসন যেমন শাসক শ্রেণীর প্রয়োজন, তেমনি এটা প্রয়োজন প্রগতিশীল ও সমাজতন্ত্রীদের জন্যও। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, একটা পর্যায়ে শাসক শ্রেণীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব তাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিক, এটা সমাজতন্ত্রীরাও চান এবং তার জন্য তাদেরকে কাজও করতে হবে।

কিন্তু সব পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রীরা এটা চাইতে পারেন না। চাইতে পারেন তখনই যখন তারা নিজেরা সংগঠিতভাবে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করাবেন, যে পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা ফেলে দিয়ে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে তারা সক্ষম। সেই অবস্থায় যদি কেউ চান যে শাসক শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসন হয়ে স্থিতাবস্থা আসুক, তাহলে সেটা হবে অবিপ্লবী কাজ এবং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

কিন্তু যখন সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম বা বিপ্লবী সংগ্রাম বলতে দেশে বিশেষ কিছু নেই, জনগণ যে সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, যে সংগ্রামে শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে জনগণকে নিয়ে দাঁড়ানো সম্ভব নয়, তখন শাসক শ্রেণীর শাসন ভেঙে পড়ার পর তার স্থানে কোনো বিপ্লবী বা সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। যা হতে পারে তা হল, সারা দেশে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বৃদ্ধি পেয়ে জনগণের সব অংশের জীবনে দুঃখ-দুর্দশা সীমাহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, যা কোনো বিপ্লবী ও সমাজতন্ত্রী চাইতে পারেন না। এজন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ যদি মনে করেন যে, শাসক শ্রেণীর এই সংকট অব্যাহত থাকুক এবং এর নিরসন প্রয়োজন নেই, তাহলে তাকে একজন করুণ ‘বিপ্লবী’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ বলতে হবে। কারণ তিনি একধরনের চাঁছাছোলা তত্ত্বের বশবর্তী হয়েই চিন্তা করছেন, যা সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে সহায়ক না হয়ে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করতেই সহায়তা করবে। কাজেই দেশে এখন সুপ্রিমকোর্ট ও সরকারের মধ্যে যে সাংঘর্ষিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এর সমাধান যেমন শাসক শ্রেণীর জন্য প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন যারা এই শাসক শ্রেণীর বিরোধী এবং এর অবসান চান তাদের জন্যও। তাছাড়া এক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার যে, শাসক শ্রেণীর শাসনের তিন স্তম্ভের মধ্যে একমাত্র আদালতই অন্তত কিছুটা জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। কাজেই আদালত বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা জনস্বার্থেই প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে যে সংবিধান তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে সমস্যা অনেক। দেশের বাস্তব পরিস্থিতির যথাযথ বিবেচনা না করে এটা প্রণীত হওয়ার কারণেই মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সংশোধনীর মাধ্যমে এতে গুরুতর পরিবর্তন আনা হয়েছিল। বলা যেতে পারে, একহাতে জনগণের জন্য কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়ার পর অন্য হাতে একের পর এক সংশোধনীর মাধ্যমে সেসব অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এসব অস্বীকার করার কিছুই নেই। শুধু তাই নয়, একই কারণে পরে আরও আটটি সংশোধনীর মাধ্যমে একই প্রক্রিয়া এদেশে জারি থেকেছে। ষোড়শ সংশোধনী হল এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত।

এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর সরকার ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন জাতীয় সংসদ কর্তৃক নিজের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করার চেষ্টা জনগণের স্বার্থকে আঘাত করার শামিল। কারণ বিচারব্যবস্থার মধ্যে সামান্য হলেও জনস্বার্থের যে রক্ষাকবচ থাকে এর মাধ্যমে তা শিথিল হয়ে পড়ত এবং জনগণ একেবারে প্রতিকারহীন অবস্থায় শাসক শ্রেণীর সরকার ও তাদের আইনসভার দ্বারা শোষিত ও নির্যাতিত হতেন। এ অবস্থায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সুপ্রিমকোর্ট সরকারের সঙ্গে যে সাংবিধানিক লড়াই করছেন, তার মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে সক্ষম হন, এটা জনগণ ও তাদের পক্ষে দেশের প্রগতিশীল শক্তিসমূহ চাইতেই পারেন। এই চাওয়ার মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতা বলে কিছু নেই। এসব কথা যারা বলে তারা সরকারি লোক, তারা চায় আইনব্যবস্থা তো বটেই, এমনকি বিচারব্যবস্থার ওপর সরকারের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম অর্থাৎ ক্ষমতায় থেকে যা ইচ্ছে করার স্বৈরতান্ত্রিক স্বাধীনতা।

পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট সেখানকার সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, প্রধান বিচারপতি একথা বলায় সরকার তার বিরুদ্ধে এমনভাবে বিষোদগার করছে যা বিপজ্জনক। মনে হচ্ছে, একথা বলে প্রধান বিচারপতি এখানকার প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার কথা বলছেন। এর থেকে কষ্টকল্পনা আর কী হতে পারে? এটাকে একটা অজুহাত হিসেবে খাড়া করে ‘প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানপন্থী’ ইত্যাদি বলে যে ভাষায় কথা বলা হচ্ছে ও তার পদত্যাগ সরকারপক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটা বিস্ময়কর। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রধান বিচারপতি ও তাদের রায়ের বিরুদ্ধে এ ভাষায় কথা বললে যে কোনো ব্যক্তিকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়া অথবা তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এখন শীর্ষ সরকারি নেতৃত্ব থেকে নিয়ে তাদের দল ও সরকারি জোটের লোকেরা যে কাণ্ড করছেন তাতে এসব প্রশ্ন আর ওঠে না। এর ফলে বাস্তবত সংবিধানসম্মতভাবে আদালত অবমাননার বিষয়টি বাংলাদেশ থেকে উঠিয়ে দেয়ার অবস্থাই তৈরি হয়েছে। এর ফলে আদালতের প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিমণ্ডলীকে তাদের নিজেদের সংবিধানেই যে মর্যাদা ও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার সমাপ্তি ঘটিয়ে তাদেরকে এক অকার্যকর ও হাস্যকর অবস্থায় এনে দাঁড় করানো হয়েছে।

মনে রাখা দরকার, আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পর লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি কায়ানি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা নিজেদের দেশ নিজেরাই দখল করেছে।’ এর ফলে বিচারপতি কায়ানির চাকরি যায়নি বা তাকে কোনো শাস্তিও পেতে হয়নি। পাকিস্তান একটা নিকৃষ্ট সাম্রাজ্যবাদের দালাল রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু সারা পাকিস্তান তো খারাপ ছিল না। এমনকি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ও তা ছিল না। এ কারণে বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে সমর্থন করায় তাদের কয়েকজনকে সংবর্ধিত করেছে শেখ হাসিনার সরকারের আমলেই। পাকিস্তানে যেমন শয়তানরা আছে, তেমনি সেখানে আছে এমন শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণ, যারা খারাপ নয়। তারাও পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর শোষণ-নির্যাতনে জর্জরিত। কাজেই পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি সেখানকার প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছেন সাংবিধানিকভাবে, একথা বলায় বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোনো সঙ্গত কারণ নেই। তাছাড়া এটা আমাদের মনে রাখা উচিত যে, শেখ মুজিবুর রহমান নিজে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে অতি সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। কাজেই পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির রায়ের উল্লেখ করার কারণে পাকিস্তানের কথা কেন বলা হয়েছে, একথা বলে কারও উত্তেজিত হওয়ার অথবা এর জন্য তার বিরুদ্ধে অনেকেই যেভাবে বিষোদগার করছেন, এটা ঠিক নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই মারাত্মক গলদ আছে।
শেষ কথার আগে এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা দরকার। প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে কী বলেছেন এটা খুব কম লোকেই পড়েছিল। তারা এ নিয়ে কোনোভাবে মাথাও ঘামায়নি। কিন্তু সরকারি মহল থেকে এ নিয়ে যেভাবে মাতামাতি করা হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে সে বিষয়টি এখন লাখ লাখ লোকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে কী আছে এ নিয়ে জনগণের ব্যাপক অংশের মধ্যে ঔৎসুক্যও সৃষ্টি হয়েছে। একটি বিতর্কের সূচনা করা হয়েছে। মানুষ আগে যা নিয়ে ভাবেনি, তা এখন তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে।

সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আপনার মন্তব্য