নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

50 years of che
ছবি: ইন্টারনেট

৫০ বছর পেরুনো সেই ইতিহাস। বলিভিয়ার জঙ্গলে যে গল্প থেমে যাওয়ার কথা ছিলো। তা রুপকথার এক মহাকাব্যিক ইতিহাস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। অর্ধ শতক আগে ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল। বলিভিয়ার জঙ্গলে বন্দি বিপ্লবী চেগুয়েভারাকে হত্যা করতে প্রস্তুত সিআই এর মদদ পুষ্ট বলিভিয়ান সেনারা। তাকে রাখা হয়েছিলো লা হিগুয়েরার ছোট স্কুল ঘরে।

দুপুরের দিকে সার্জেন্ট মারিও টেরেন সেই ঘরে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, চে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন।  সার্জেন্ট মারিকে দেখেই চে বুঝতে পারেন তাকে হত্যা করতে এসেছে এই সৈনিক। হাত বাধা চে বলিষ্ঠ কন্ঠে মারার আগে তাকে উঠে দাড়ানোর জন্য অপেক্ষা করতে বলেন। এই কথা শুনেই ভয়ে সার্জেন্ট টেরেন কাঁপতে থাকেন। দ্রুত তিনি দৌড়ে ঘর থেকে পালিয়ে যান। 

কিন্তু টেরেনের কমান্ডার তাকে ফিরে গিয়ে গুলি করতে নির্দেশ দেন। মদপ্য সেই সৈনিক এরপর দ্রুত ঘরে প্রবেশ করে চের দিকে গুলি ছুড়তে থাকনে। পরপর ৯টি গুলি করে চে’কে বিদ্ধ করে। মৃত্যুর আগে চে’ বীরত্বের সাথে উচ্চারন করেন- কাপুরুষ তোমরা কেবল একজন মানুষকেই মারছো।

বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে চে

এই হত্যা মিশনে ছিলো সিআই এর এজেন্ট  ফেলিক্স রডরিগেজ। চে গুয়েভারাকে নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা মার্কিন সাংবাদিক জন লি লেনন তার ‘চে গুয়েভারা- এ রেভুলেশনারি লাইফ’ বইতে উল্লেখ করেন, বন্দি চে’কে হত্যা করা হবে এই খবরটি চে’কে দেন সিআইএর এজেন্ট ফেলিক্স রডরিগেজ। তখন ফেলিক্সের উদ্দেশ্যে চে বলেছিলেন, “ ফিদেলকে বলো সমগ্র আমেরিকাতে সে বিপ্লবের যাত্রা দেখতে পারবে। আর আমার স্ত্রীকে বলো সে যেন বিয়ে করে সুখী হয়।” 

জন লেনন এর কাছে এই ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়া সেই হত্যা মিশনে থাকা ফেলিক্স রডরিগেজ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “ওই মুহুর্তটি ছিলো অন্য রকম আবেগময়। আমি আর তাকে ঘৃণা করতে পারিনি। কি সাহসিকতায় বীরের মতো মৃত্যুকে মোকাবেলা করেছিলো সে”

চে গুয়েভারা ছিলো এমনই আদর্শে অটল এক আর্কষনীয় সাহসী মানুষ, যে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর আগেও শত্রুর হৃদকম্পন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। যার দৃঢ়তা শত্রুপক্ষকেও শ্রদ্ধাবনত হতে বাধ্য করেছে।

সেদিন চে’কে হত্যা করা হলেও স্ফূলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে তার চেতনা সাহস। এ-হত্যাকাণ্ডের খবরে একজন কিংবদন্তী গেরিলা হিসেবে চে শক্তিশালী একটি বৈশ্বিক রূপ পেয়ে যান। সারাবিশ্বে সংবাদপত্র ও টিভিতে তাঁর মৃতদেহের ছবি প্রচার যায়। তারপর চে হাজির হয়ে যান লাল পোস্টার, গান, কবিতা, বই আর সিনেমার মাধ্যমে পৃথিবীর প্রায় সব শহরে, রাস্তা-রাস্তায়, মিছিলে আর স্লোগানে।

মহান কিংবদন্তী বিপ্লবী এ মানুষটি জন্ম নেন আর্জেন্টিনায় ১৯২৮ সালের ১৪ জুন। তার পিতা আর্নেস্তো গেভারা লিঞ্চ আর মা সেলিয়া ল্য সেরেনার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জৈষ্ঠতম। ছোটবেলা থেকেই তার চরিত্রে অস্থির চপলতা দেখে তার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন যে আইরিস বিদ্রোহের রক্ত তার এই ছেলের ধমনীতে বহমান। খুব শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায়, দরিদ্রদের প্রতি একধরনের মমত্ববোধ তাঁর ভিতর তৈরি হতে থাকে।

পড়াশোনায় চে বেশ মেধাবী ছিলো শৈশবেই। ছোট বেলা থেকে প্রকৌশলী হওয়ার পরিকল্পনা করলেও পরে সে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন।

ছাত্র থাকা অবস্থাতেই ১৯৫২ সালে বন্ধু ... নিয়ে বের হয়ে যান ল্যাতিন আমেরিকা ভ্রমণে। এই ভ্রমণেই বদলে যেতে থাকে তার চিন্তা। একদিকে মানুষের ক্ষুধা, কষ্ট, দূর্দশা আরেক দিকে অল্প কিছু মানুষের ভোগ বিলাসী জীবনে শোষন নির্যাতনের চিত্র। এসব বৈষম্যই তাকে নতুন পথের দিশা দেয়।

১৯৫৩ সালে গুয়েতমালায় অবস্থান কালে চে প্রথম বারে মতো রাজনৈতিক আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। তখন গুয়েতমালায় এসময় সেখানে চে’র সাথে পরিচয় হয় কয়েক নির্বাসিত কিউবান বিপ্লবীর সাথে।
১৯৫৫ সালের জুন মাসে তার বন্ধু নিকো লোপেজ রাউল কাস্ত্রোর সাথে তার পরিচয় করান এবং পরে তার বড় ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে পরিচিত হন। কাস্ত্রোর সাথে তার প্রথম সাক্ষাতে দীর্ঘ আলাপচারিতা হয় এবং চে বলেন, যে কিউবার সমস্যা নিয়ে তিনি চিন্তিত। তারপর তিনি ২৬ জুলাই আন্দোলন দলের সদস্য হন। বিপ্লবের প্রস্তুতি নেন।

বিপ্লবী মানুষের এখনও হৃদয়জুড়ে আছেনে চে

১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর তারা কিউবার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পৌঁছানোর সাথে সাথেই বাতিস্তার সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রন্ত হন। তার ৮২ জন সহচরী মারা যান অথবা কারাবন্দী হয়, মাত্র ২২জন এ যাত্রায় বেঁচে যায়।

চে লিখেছিলেন সেটা ছিল সেই রক্তক্ষয়ী মুখামুখি সংঘর্ষের সময় যখন তিনি তার চিকিত্সা সামগ্রীর সাথে একজন কমরেডের ফেলে যাওয়া এক বাক্স গোলাবারুদ নিয়েছিলেন, যা তাকে পরিশেষে চিকিত্সক থেকে বিপ্লবীতে পরিণত করে। 

ফিদেলের নেতৃত্বে সেই লড়াইয়ে চে হয়ে ওঠে গেরিলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার। সম্মুখ যুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকার জন্য ফিদেল কাস্ত্রো চে গুয়েভারাকে কমাদান্তে উপাধিতে ভূষিত করেছিলো।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত চে কিউবার শিল্প বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৫ সালে চে বিপ্লবের জন্য আফ্রিকায় যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং কঙ্গোয় চলমান যুদ্ধে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানকার কমিউনিষ্ট পার্টির অসহযোগীতায় তাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয় কঙ্গো থেকে। এরপর কিউবাতে অল্প কিছুদিন অবস্থান করে বলিভিয়া বিপ্লবের চেষ্টা শুরু করেন।

কিন্তু এক পর্যায়ে ধরা পড়েন বলিভিয়ার সৈন্যদের হাতে। ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর তিনি আহত অবস্থায় আটক হন।  এরপর ৯ অক্টোবর তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই বিপ্লবের যে মৃত্যু নেই। যে চে কে হত্যা করা হলো তিনিই জেগে রইলেন স্লোগানে, মিছিলে, পোস্টারে, মুক্তির সংগ্রামে।

আপনার মন্তব্য