অন্যকে জানাতে পারেন:

ছবি: বাংলা

মাসুদ খান


সরু চালের কেজি ৭০ টাকা। মোটা চালও কেজি ৫০ টাকার উপরে। সবজির দাম কমপক্ষে ৬০ টাকা কেজি। শিমের কেজি ১৬০ টাকা। টমেটো ১২০ টাকা। কাঁচা মরিচ ২৫০ টাকা। পত্রিকায় খবর এসেছে মানুষ বলছে যার পকেটে কাঁচা টাকা আছে সে ই কেবল কাঁচা বাজারে যেতে পারে। কার পকেটে কাচা টাকা? কাচা টাকা থাকতে পারে সরকারের আমলা কর্মকর্তাদের কাছে। ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সরকারি লোকদের কাছে। সরকার দলীয় ও বড় বড় কোটিপতি শোষক মালিক ব্যবসায়ী এবং লুটেরাদের কাছে। শ্রমিকের তো বেতন বাড়েনি। মানুষের মত বাঁচার জন্য উপযুক্ত মজুরী তো দূরে থাক, যে শ্রম সে দেয় তার দাম নিয়ে কোন কথা বলার অধিকারটুকুও এখানে নাই। কৃষকেরও তো আয় বাড়েনি বরং বন্যায় আরো নিঃস্ব হয়েছেন। সরকার না হয় কয়েক লাখ সরকারি চাকুরের বেতন দ্বিগুন করেছে। সীমিত আয়ের কোটি কোটি মানুষ তো কোন গুপ্ত ধন পেয়ে রাতারাতি বড় লোক হয়ে যায়নি। দেশের ষোল কোটি মানুষ কি অপরাধ করেছে, কোন পাপের শাস্তি তাদের ভোগ করতে হবে? জিনিসপত্রের এমন আকাশ ছোঁয়া দাম বৃদ্ধি কেন? শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত মানুষ জীবন নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোন কার্যকর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

খবরে এসেছে এবার বন্যায় দেশের এক বড় অংশে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চালের যোগান কম। চালের সরকারি মজুদও কম। আগে থেকে সরকারিভাবে চালের মজুদ বাড়ানো হয়নি যাতে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অথচ, বন্যার সময় দেশের প্রধানমন্ত্রীও বড় গলায় বলেছেন, বন্যা আসছে জেনে সরকার বন্যা মোকাবেলায় সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কি সেই প্রস্তুতি? পঁচা গম খাওয়ানো খাদ্যমন্ত্রী বেশী দাম দিয়ে মিয়ানমার থেকে আতপ চাল কিনে এনেছেন, যে চাল দেশের অধিকাংশ মানুষই খায় না। তারপর জনগণকে নসিহত দিয়েছেন, সেদ্ধ চালের চেয়ে আতপ চাল ভাল। তারপরও কম দামে হলেও ঐ চাল মানুষ কেনেনি। জানার পরও যে চাল দেশের মানুষ খায় না সে চাল কেন কিনে আনলো? যাতে লুটপাট করা যায় সেজন্য? এই কি প্রস্তুতির নমুনা?

খোলা বাজারে বিক্রির চাল এবং বন্যার ত্রাণের চাল বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী নেতারা বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পরেছে সে খবরও পত্রিকায় এসেছে। ক’দিন আগে চালের দাম কমানোর জন্য সরকার চাল ব্যবসায়ীদের একটু চাপ দেবার উদ্যোগ নিয়েছিল। হোমরা চোমরা ব্যবসায়ীরাতো মন্ত্রী এমপিদেরই আত্মীয় স্বজন। সরকার দলীয় লোকজন। তাদের সাথে সরকারের ‘অনাত্মীয়র মত’ আচরণ করা কি চলে?! পরপরই এই ব্যবসায়ীরা দাম আরো বাড়িয়ে একদিকে জনগণকে জিম্মি করেছে আর অন্য দিকে সবাই মিলে ঘটা করে প্রধাণমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। ব্যাস সব ঠান্ডা। সরকারের আর কোন রা নাই। দাম বেড়েই চলল। দাম বৃদ্ধির প্রতিকার দূরে থাক, সরকারিভাবে আমদানি ট্যাক্স তুলে নেয়ায় ব্যবসায়ীদের বরং আরো পোয়াবারো। ব্যবসায়ীদের লাভ আরো বাড়লো। আর যত ভোগান্তি, দামের বোঝা তা চাপানো হলো দেশের সীমিত আয়ের অধিকাংশ জনগণের উপর। এভাবেই সব অন্যায় চলছে।

 মাসুদ খান, ছবি: নাঈম সিনহা

সরকার এবং শাসক শ্রেণি, বড়লোকগুলো ব্যস্ত গদী নিয়ে, নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে। জিনিষপত্রে দাম বাড়ায় মানুষের দিন চালানো কঠিন হয়ে পরছে সে ভোগান্তি দূর করার ব্যাপারে এদের মনোযোগ নাই। আওয়ামী আর বিএনপি জোটের ছাতায় একাট্টা এই বড় বড় কোটিপতিরা বরং মানুষের ভোগান্তিকে পুঁজি করে কে, কিভাবে নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে পারে তা নিয়ে মত্ত। আর দেশের অধিকাংশ মানুষের এই মূহুর্তের দাবি হলো- অবিলম্বে চালসহ সকল নিত্যপণ্যের দাম কমাতে হবে। আমরা খেটে খাওয়া অল্প আয়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ যারা এদের ফায়দা লুটার কল থেকে বাঁচতে চাই তাদেরই নিজেদের রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে। তাহলেই কেবল ওরা বাধ্য হয়ে দাম কমানোর জন্য তৎপর হতে পারে।

আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পায়তারা শুরু হয়েছে। বিদ্যুত খাতের বিভিন্ন কোম্পানি প্রায় ২১% পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এক বছরে এ হলো দ্বিতীয়বার। দাম যাতে বাড়ানো যায় সেজন্য শুনানী করা হয়েছে। এটা হলো জনগণকে ধোকা দিয়ে বিদ্যুত কোম্পানিগুলোর মুনাফা রক্ষা ও বৃদ্ধিকে জায়েজ করার ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছে, বেসরকারি কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে বেশি বেশি বিদ্যুৎ কেনার কারণে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার হচ্ছে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের লাভ দেয়ার জন্য এই দাম বাড়ানো। কোটি কোটি জনগণের কাছ থেকে বিদ্যুতের বাড়তি দাম আদায় করে সেটা বড় বড় কোটিপতির পকেটে পুড়ে দেবার ব্যবস্থা করছে সরকার। এ অন্যায় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো চলবে না।

 ছবি: নাঈম সিনহা

যে জ্বালানী তেল দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরী হয় আন্তর্জাতিক বাজারে তার দাম প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগে নেমে আসার পরও সরকার তেলের দাম কমায়নি। এতকম দামে কিনে অনেক বেশি দামে বিক্রি করে অতিরিক্ত বাড়তি মুনাফা করেই গেছে। তেলের দাম কমায় বিদ্যুতের দাম না কমিয়ে দফায় দাম বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের লাভ দিতে আবারো বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসায়ীদের লাভের জন্য সাধারণ মানুষের উপর ডাকাতি আর কত?!

আবার সবাই জানেন বিদ্যুৎ এমন এক পণ্য যার দাম একগুন বাড়লে অন্য সব পণ্যের দাম বাড়ে কয়েক গুন। কেননা, বিদ্যুৎ দিয়েই কলকারখানা চলে, কৃষির সার তৈরী হয়, সেচ চলে, প্রায় সবকিছুর তৈরিতে কোন না কোনভাবে বিদ্যুৎ লাগে। সুতরাং, বিদ্যুতের দাম বাড়লে চালসহ প্রায় সব জিনিষে তার প্রভাব পরবে। দাম বাড়বে। বাড়বে বাসা ভাড়াও। সুতরাং, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মানে হলো জনগণের উপর আরো এক ধাপ বাড়তি বোঝা চাপানোর পদক্ষেপ। এ অন্যায্য পদক্ষেপ মানা যায় না।

শোষিত, নিপীড়িত মানুষদের বুঝতে হবে- শোষকরা তাদের স্বার্থে কাজ করবেই। ওদের ক্ষমতা দিয়েই ওরা নিজেদের শোষণ-মুনাফা-লুন্ঠন নিশ্চিত করবে। ক্ষমতার জোড়ে শোষণের নিত্যনতুন আয়োজন করবে। আর তাতে জনজীবনে ভোগান্তি জিইয়ে রাখবে, বাড়িয়ে তুলবে। তাই দাম বৃদ্ধির ভোগান্তি থেকে চুড়ান্তভাবে বাঁচতে হলে শোষিত নিপীড়িত জনগণের হাতেই ক্ষমতা লাগবে। সেজন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই বেগবান করতে হবে। শ্রমিক কৃষক নিপীড়িত জাতি ও জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক: সভাপতি, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ

আপনার মন্তব্য