অন্যকে জানাতে পারেন:

ফাইল ছবি

ডা. পলাশ বসু, চিকিৎসক ও শিক্ষক
সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ
এনাম মেডিকেল কলেজ, সাভার, ঢাকা

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে চাইলেই এখন পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যে কোন সময় যে কারোর সাথে অনায়াসেই যোগাযোগ করা সম্ভব। সীমানার বেড়াজাল টপকাতে পলক ফেলা সময়ই ঢের বেশি। দুরত্ব আজ তাই আর কোন বাঁধা নয়।

একটি সময় ছিলো যখন প্রয়োজনে প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম ছিলো প্রধানত চিঠি। পরে  টেলিফোন আসলেও তা মোবাইল ফোনের মতো এত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো না বা হওয়ার সুযোগ ছিলো না। তাছাড়া সেখান থেকে কল করাও ছিলো রীতিমতো ঝক্কির ব্যাপার। তাই, হয়তো বন্ধুর জন্য বিরহকাতর ব্যক্তির মনের কথা উপলব্ধি করেই লেখা হলো ‌‌‌‌‘‘নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম / বন্ধুর কাছে মনের খবর ক্যামনে পৌঁছাইতাম’’ এর মতো কালজয়ী গান। এ গান বর্তমান সময়েও অত্যন্ত জনপ্রিয় ঠিকই তবে বড্ড অচল এ গানের গীতি। কারণ, হাতে হাতে আছে মোবাইল ফোন। প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ করতে শুধু ইচ্ছা আর অবসরটুকু পেলেই হলো।

তারুণ্যের প্রয়োজন মেটাতে মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়তই যুক্ত হচ্ছে নিত্য নতুন প্রযুক্তি। ইন্টারনেটের ব্যবহার থেকে শুরু করে টেলিভিশন দেখা, ছবি তোলা, সেলফি, ভিডিও, গান শোনা, কল কনফারেন্স, টাকা পয়সার লেনদেন থেকে গাড়ী ট্রাকিং, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার- এমন হরেক রকমের সুযোগ সুবিধায় ভরপুর মোবাইল ফোনই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। আগে কথা বলতে পারলেই হতো। এখন শুধুমাত্র কথায় আর চিড়ে ভিজছে না বোধ হয়।

মোবাইল ফোন ছাড়া জীবন এখন অচল। পরিবার, পরিজন ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কাজই আজ চোখের নিমিষেই সম্ভব। স্থান-কাল এখন উবে গেছে। শুধু ইচ্ছা থাকলেই যে উপায় হয় –এখন যেন সেটারই জয় জয়াকার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দিকে দিকে।

কিন্তু মোবাইল ফোনের এমন সহজলভ্যতা ও নানাবিধ কাজে ব্যবহারের উপকারিতা ও উপযোগিতা সত্ত্বেও যুক্তিযুক্ত কিছু আশঙ্কার কথা কেন যেন মাথা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ আশঙ্কাকে ”দই দেখে চুন খাওয়ার” মতো ব্যাপার মনে করে কেউ মুখ টিপে হাসলেও হাসতে পারেন। তাতে, গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া মোবাইল ফোন সংক্রান্ত ঋনাত্মক ফলাফল কিন্তু মিথ্যে হয়ে যাবে না। বরং এ ফলাফলকে মাথায় রেখে নিজস্ব কাজে কর্মে মুঠোফোনের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই আখেরে নিজেরই লাভ। তাই, বরং আসুন সে বিষয়েই সবাই দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।

কেন্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ৬ ডিসেম্বর, ২০১৩ তে। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ড. এন্ড্রু লেপ, ড. জ্যাকব বার্কলে এবং ড. এরিন কার্পিনিস্কি ৫০০ জনেরও বেশি  শিক্ষার্থীর উপর মোবাইল ফোনের ব্যবহারের সাথে তাদের উদ্বিগ্নতা, জিপিএ প্রাপ্তি এবং মানষিক শান্তি কিভাবে জড়িত সে বিষয়সমূহের উপর গবেষণা চালান। এজন্য তারা এ সমস্ত শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনের ব্যবহার রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে গবেষকগণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  এ সমস্ত শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত জিপিএ সংগ্রহ করেন।

ডা. পলাশ বসু, চিকিৎসক ও শিক্ষক। ছবি: বাংলা ডেস্ক

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যে সমস্ত শিক্ষার্থী খুব বেশি বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছে তাদের প্রাপ্ত জিপিএ কম এবং তারা বেশি উদ্বিগ্নতায় ভুগে থাকে এবং মানষিকভাবে কম সুখী; যারা মোবাইল ফোন তুলনামুলক কম ব্যবহার করেছে তাদের চেয়ে।

এক বছর আগে ( ২০১২ ইং) ড. এন্ড্রু লেপ এবং ড. জ্যাকব বার্কলে তাদের অন্য একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বেশি বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুসের কর্মক্ষমতা যারা নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় মুঠোফোন ব্যবহার করেন তুলনামূলকভাবে তাদের চেয়ে কম।

তাছাড়া, মোবাইল ফোনের অতিমাত্রায় ব্যবহার ব্রেন টিউমার, কানে কম শোনা, মাথাব্যথা এবং দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার মতো রোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করা হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৩১ মে, ২০১১ তে প্রকাশিত তাদের গবেষণায় মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গমাত্রাকে সম্ভাব্য ব্রেন টিউমার সৃষ্টির একটি অনুঘটক হিসেবে উল্ল্যেখ করেছে। যদিও আমেরিকার খাদ্য এবং ঔষধ প্রশাসন (US FDA) এর সাথে একমত পোষণ করেনি।

অন্যদিকে, অষ্ট্রিয়ার গ্রেজ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পুরুষত্বহীনতার জন্য মোবাইল ফোনের অত্যধিক ব্যবহারকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, যে সমস্ত পুরুষেরা সপ্তাহে মোট ১৭.৬ ঘন্টা মুঠোফোন ব্যবহার করেন তাদের পুরুষত্বহীনতায় ভোগার  সম্ভাবনা বেশি।

তাছাড়া, আপনার জেনে অবাক হবেন যে, মোবাইল ফোন বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও দিনদিন বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮৮ সালে আমেরিকাতে ৫ লক্ষ মোবাইল ফোনের বিস্ফোরণের হয়েছে। ১৯৯৩ সালে তা বেড়ে ১ কোটি ৩০ লাখে দাঁড়িয়েছিলো। সর্বশেষ, প্রাপ্ত পরিসংখ্যান যা ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে সেখানে ২২কোটি  ২৩ লাখ মোবাইল ফোন বিষ্ফোরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের দেশেও এমন বিস্ফোরণের খবর পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৪ সালে মোবাইল ফোন চার্জে দিয়ে কথা বলার সময়ে তা বিস্ফেরিত হয়ে একজন ছাত্রীর মৃত্যুও হয়েছে। তাই মোবাইল ফোন চার্জে দিয়ে কখনই কথা বলা উচিত নয়। এছাড়া  ট্রেনে কাটা পড়া, সড়ক দূর্ঘটনা সহ নানা রকম দূর্ঘটনার জন্যও মোবাইল ফোনের ব্যবহারকে দায়ী করা হয়ে থাকে।

তাই মোবাইল ফোনের এমন বাড়বাড়ন্ত সময়ে শুধুই চোখ কান বুজে তা ব্যবহার করে গেলেই হবে না। কারণ, মোবাইল ফোনের সাথে  ঘাতক ব্যাধি থেকে শুরু করে মানষিক অবসাদের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তাই এর ব্যবহার হতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিত।

যথেচ্ছ নয়; বরং ইচ্ছে ঘুড়ির লাগাম টেনেই মোবাইল ফোনের ব্যবহার করা উচিত। একটানা মোবাইলে বেশিক্ষন কথা বলাও ঠিক নয়। খুব বেশি প্রয়োজন হলে গ্যাপ দিয়ে দিয়ে কথা বলুন। তাতে প্রযুক্তির সুবিধা যেমন কাজে লাগানো যায় তেমনিভাবে তার ক্ষতিকর দিকও অনেকটাই এড়িয়ে চলা সম্ভবপর হয়।

আপনার মন্তব্য