ছবি: সংগৃহীত

মরে, পুড়ে, ধর্ষিত হয়ে নি:স্ব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত হচ্ছেন দেশছাড়া। কথিত সন্ত্রাসি হামলার জবাবে উত্তর রাখাইনে, ভয়ংকর স্কর্চআর্থ বা পোড়ামাটি অপরাশেন চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এই মুহুর্তে বিশ্বে সবচেয়ে হতভাগা-অত্যাচারিত-নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী এই রোহিঙ্গারা। শুরু থেকেই মিয়ানমার সেনাদের এই অপারেশনকে জেনোসাইড আর জাতিগত নিধন বলে অভিহিত করছেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট থেকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের মতে- রাখাইনে গণহত্যা, খুন-ধর্ষণ আর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা হলে, ফেঁসে যাবেন মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তারাসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ। তারা বলছেন, মামলা করতে পারে বাংলাদেশসহ যে কোন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।

কারা জড়িত ঘৃণিত মানবতাবিরোধী এই অপরাধে? রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে, এই নিধনযজ্ঞের সেনা কর্মকতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। আরেকটি সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছে এতে মদদই দিচ্ছে বা কারা?

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পশ্চিমাঞ্চল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল মঙ মঙ সো'র নেতৃত্বে ২হাজারেরও বেশি প্রশিক্ষিতি বিশেষ বাহিনী চালাচ্ছে রাখাইন ধ্বংসযজ্ঞ। তারা ইতোমধ্যে হত্যা করেছে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে। ধর্ষণ করছে নারীদের। নারকীয় কায়দায় মেরে ফেলছে শিশুদের। এই কাজে মাঠ পর্যায়ে অভিযানে অংশ নিচ্ছে মেজর জেনারেল খিং মঙ সোর নেতৃত্বে ১৫ এলআইডি। উত্তর রাখাইনের বুথিডং ও মংডুর বিভিন্ন গ্রামে এরা চালাচ্ছে সেনাবাহিনীর ক্লিয়ারেন্স অপারেশন। আর এতে প্রধান মদদদাতা রাখাইনের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল মঙ মঙ ওন।

রাখাইনের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল মঙ মঙ ওন।

এই সব কাজ নেপিডোতে বসে সরাসরি তদারক করছেন সুপ্রিম কমান্ডার, মিয়ানমার সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিঙ অং লাইং।

মিয়ানমার সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিঙ অং লাইং

নিরাপত্তা উপদেষ্টা উ থং থুন সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে সাফাই গেয়েছেন সেনাদের পক্ষে।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা উ থং থুন।

দেশটির নৌ বাহিনীর সাবেক এডমিরাল সো থেইন আর সাবেক নাসাকা বাহিনীর প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল খিন ন্যুইত রোহিঙ্গা হত্যা আর বিতাড়নের মূল কারিগর।

রোহিঙ্গা হত্যা আর বিতাড়নের মূল কারিগর খিন ন্যুইত।

রাখাইন পার্টির চেয়ারম্যান আয়ে মং, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উইরাথু আ ডাইভারসিটি পার্টির প্রধান নাই মিও ওয়াই প্রকাশ্যে বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের নিধনের আহ্বান জানিয়েছেন সেনাবাহিনীকে। তবে দেশটির প্রধান রাজনীতিবিদ স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি সেনাবাহিনীকে থামাতে নেননি কোন ভূমিকা।

রাখাইন পার্টির চেয়ারম্যান আয়ে মং।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডি সেন্টারের পরিচালক বলছেন, রাষ্ট্রীয় মদদেই রাখাইনে চলছে পর্যায়ক্রমিক জেনোসাইড।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড: ইমতিয়াজ আহমেদ রেডিও তেহরানকে বলেন, রোহিঙ্গারা একই সাথে রাষ্ট্রবিহীন ও উদবাস্তু। এরকম জনগোষ্ঠী  দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানের কারণে অমাদের দেশের জন্যও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের সমস্যার সমাধান না হলে জটিলতা বাড়তে পারে। মিয়ানমার সরকারের সাথে এটি ছাড়াও অন্যান্য ব্যাপারে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা দরকার।

নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি'র আইন অনুযায়ী সংস্থাটি বিচার করতে পারে, জেনোসাইড, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ কিংবা কোন জাতির প্রতি আক্রমণ করার অপরাধের। আইসিসি পরিচালনা আইনের অনুচ্ছেদ-৫ ও ৬ অনুযায়ী জাতিগত নিধন-গণহত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট-অগ্নিসংযোগ কিংবা জোর করে বিতাড়নের সবধরনের অপরাধে বিচারের মুখোমুখি হতে পারে মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষ।

এদিকে রোমভিত্তিক স্থায়ী গণ আদালত, মিয়ানমারের গণহত্যা নিয়ে উন্মুক্ত বিচার আদালত বসিয়েছে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। এরই মধ্যে তারা মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার।

এই আদালতের রায় ভবিষ্যতে, রোহিঙ্গা গণহত্যায় দায়ীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে বেশ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আপনার মন্তব্য