suchi-modi
ফাইল ছবি

রাখাইন রাজ্য থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষদের উচ্ছেদে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে গিয়ে সে দেশের ডি-ফ্যাক্টো সরকারের দাবিকৃত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’র প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জারি রাখার কথা জানিয়ে এসেছেন।

পরে বাংলাদেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভারত রাখাইনের ‘বেসামরিক নাগরিক’দের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে আইনানুগ পথে সংকট নিরসনের তাগিদ দিয়েছে। তবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের ব্যাপারে কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে দিল্লি।

একটি কূটনৈতিক জানিয়েছেন, ভারত মিয়ানমার সংক্রান্ত কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা রাখাইনে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ভিন্ন অবস্থান দিতে দেখা গেছে। রাখাইন পরিস্থিতিকে তারা দেখছে ‘মানবিক সংকট’ হিসেবে।

মিয়ানমার সফরকালে অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘যখন দেশটি একটি শান্তি প্র্রক্রিয়ায় আসছে অথবা সমস্যা সমাধানের পথে আছে, তখন আমরা চাই মিয়ানমারের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করবে।’

সে সময় রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান জাতিগত নিধনযজ্ঞের ব্যাপারে কোনও অবস্থান নেননি মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও কোনো আহ্বান রাখেননি তিনি। বরং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সঙ্গে যুথবদ্ধ হয়ে কাজ করবে ভারত।

মোদি সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ভারত সরকার অভিযোগ করছে, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ইসলামি উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তা সত্ত্বেও উদ্বাস্তু উচ্ছেদ প্রচেষ্টার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে দেশটিকে।

ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক মিয়ানমার সফরে নরেন্দ্র মোদি এ ব্যাপারে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা অং সান সু’চির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। দিল্লিতে মোদির সমর্থকরা তার মতো করেই রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওই রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই হাতিয়ার মানছেন। তারা বলছেন, রাখাইনের মুসলিমদের দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক স্থবিরতাই তাদের চলমান এই অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। একই ধরনের বক্তব্য ধ্বনিত হয়েছে সু চি’র কণ্ঠেও। 

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।

তিনি বলেছেন, অবৈধভাবে যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে ভারতে এসেছেন, তাদের ফিরে যেতে হবে। তবে ভারতে আগত এমন প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো দ্বিপাক্ষিক কোনও চুক্তি নেই। ফলে সংকট উত্তরণের সহজ কোনও পথ নেই।

দিল্লির একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ রাখাইন রাজ্যে ভারতের বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। রাখাইনে ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপ এসারের বেশকিছু প্রকল্প রয়েছে।মিয়ানমারের অর্থনীতিতে অংশীদারত্ব নিশ্চিতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে ভারত। এ লক্ষ্যেই যৌথ বা সহায়তা প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো, বন্দর নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করছে ভারত।এসব প্রকল্পে সরকারিভাবে কোটি কোটি রুপি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকায় ভারত স্বভাবতই মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনও ধরনের অবনতি চাইবে না। তারা চাইবে না, নিজেদের কোনও প্রকল্পে দেরি হোক।

ভারতে সিপিআই (এম), কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস এরই মধ্যে মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তে বিরোধিতার কথা জানিয়েছে। তবে বিজেপি ছাড়া কোনও দলই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য নেপিডোকে চাপ দিচ্ছে না। সব দলই রাখাইনে রোহিঙ্গাদের হত্যা বন্ধ ও তাদের উদ্বাস্তুকরণের বিপক্ষেই সরব। এদিকে বাংলাদেশ বরাবরই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিয়ে আসছে। তবে বিজেপি ছাড়া এখন পর্যন্ত ভারতের কোনও রাজনৈতিক দলই বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানায়নি। 

আপনার মন্তব্য