mayanmer takes new formula
ফাইল ছবি

রাখাইন রাজ্য নিয়ে গঠিত কফি আনান কমিশনসহ দুটি কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে মিয়ানমার। গত মঙ্গলবার মিয়ানমার সরকার গঠিত ওই কমিটিকে পরস্পরবিরোধী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। আর এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কৌশলে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আনান কমিশনের সুপারিশ দেশটি অগ্রাহ্য করবে।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট তিন কিউর এক প্রজ্ঞাপনের বরাত দিয়ে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দপ্তরের ফেসবুক পেজ থেকে সমাজকল্যাণ ও ত্রাণমন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ের নেতৃত্বে ওই কমিটি গঠনের কথা জানা গেছে।

রাখাইন রাজ্যের জনগণের কল্যাণে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে অং সান সুচি ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশন গঠন করেন, যা আনান কমিশন নামে পরিচিত।

সু চি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন। কমিশন গঠনের এক মাস পর অক্টোবরে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-ধর্ষণসহ সব ধরনের তাণ্ডব শুরু হয়। এরপর ডিসেম্বরে ওই মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিতর্কিত সাবেক জেনারেল মিন্ট সোয়ের নেতৃত্বে রাখাইন রাজ্যবিষয়ক জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।

মিন্ট সোয়ের কমিশন গত ৬ আগস্ট দেওয়া তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশন মূলত তাদের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারে গুরুত্ব না দিয়ে সেখানকার উন্নয়নে বেশি জোর দিয়েছে। তা ছাড়া কমিশন তাদের সুপারিশে নিজেদের এবং আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব রেখেছে।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন ২৪ আগস্ট তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ৮৮টি সুপারিশ করে। রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করে রাজ্যের সব জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বসহ কাজের ও চলাফেরার মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেছে। গত মার্চে আনান কমিশন তাদের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন দিয়েছিল মিয়ানমার সরকারকে।

অং সান সু চির উদ্যোগে গঠিত কমিশন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন গভীর রাত থেকেই তল্লাশিচৌকিতে হামলার জের ধরে নিরপরাধ লোকজনের ওপর সহিংসতা শুরু করে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী।

রাখাইনের জাতীয় তদন্ত কমিশন আর আনান কমিশন তাদের প্রতিবেদনে লোকজনের নাগরিকত্ব বিষয়ে বিপরীতধর্মী সুপারিশ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কমিটি কীভাবে রাখাইনের জনগণের উন্নয়নে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় কাজ করবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১৫ সদস্যের কমিটি রাখাইনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত অঞ্চলে সামাজিক উন্নয়নে কাজ করবে। পাশাপাশি তারা জাতিগত সংখ্যালঘু বসবাসকারীদের গ্রাম এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত লোকজনের শিবিরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করবে।

কমিটি রাখাইনের লোকজনের আগের নাগরিকত্ব আইনকেই ভিত্তি করার কথা জানিয়েছে। ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। এতে মিয়ানমারে বসবাসকারীদের ‘নাগরিক’ (সিটিজেন), ‘সহযোগী’ (অ্যাসোসিয়েট) ও ‘আত্মীকৃত’ (ন্যাচারালাইজড) তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এমনকি দেশটির সরকার তাদের প্রাচীন নৃগোষ্ঠী হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়নি। ১৮২৩ সালের পরে যারা মিয়ানমারে এসেছে, তাদের ‘অ্যাসোসিয়েট’ আর ১৯৮২ সালে নতুনভাবে দরখাস্তকারীদের ‘ন্যাচারালাইজড’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

ওই আইনের ৪ নম্বর প্রভিশনে আরও শর্ত দেওয়া হয়, কোনো জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কি না, তা আইন-আদালত নয়; নির্ধারণ করবে সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘কাউন্সিল অব স্টেট’। এই আইনের কারণে রোহিঙ্গারা ভাসমান জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়।

সু চি যাচ্ছেন না জাতিসংঘে

রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন না মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে তাঁর নিউইয়র্ক সফরের কথা ছিল।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জ তে জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সু চি যোগ দেবেন না। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেশের অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ভেন থিও মিয়ানমারের নেতৃত্ব দেবেন। প্রসঙ্গত, সেনাবাহিনীর সাবেক এই মেজর সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির একজন পার্লামেন্ট সদস্য।

জাতিসংঘের আলোচনায় সু চির বিরত থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিয়ানমারের মুখপাত্র বলেন, ‘দুই কারণে তিনি যাচ্ছেন না। প্রথমত রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি। আমরা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি এবং জননিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার অনেক কাজ রয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, দেশে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারে আমাদের কাছে খবর এসেছে।’

আপনার মন্তব্য