rohinga-and-history
প্রতীকী ছবি

ক্য থিং অং


৩১শে ডিসেম্বর ইংরেজি বছরের শেষ দিন। এ দিবসের সূর্য্যাস্তের সাথে সাথে সবার মাঝ থেকে একটি বছর হারিয়ে যাবে। হিসেব নিকেশও হয়তো মিলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে অনেকে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি নিয়ে। পরদিবসের সূর্য্যোদয়কে স্বাগত জানাবে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু রাখাইন জাতির জীবনে ৩১শে ডিসেম্বর একটি অভিশপ্ত দিন হিসেবে চিহ্নিত।

১৭৮৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর তারিখে সূর্য্যাস্তের সাথে সাথে লুন্ঠিত হয়ে যায় রাখাইন সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। ১৭৮৫ সালের প্রথম সূর্য্যােদয় আনন্দের প্রত্যাশা নিয়ে উদ্বেলিত হয়ে উঠেনি রাখাইনদের মনে। তাঁরা সূর্য্যােদয়ের সাথে সাথে দেখতে পেয়েছে তাদের চির চেনা প্রিয় পিতৃভূমি, যে সাম্রাজ্য সুদীর্ঘ ৫০০০ বছরধরে দূদান্ত প্রতাপ নিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে গর্ব করে এসেছে। সে রাখাইন সাম্রাজ্যকে গ্রাস করে নিয়ে রাখাইন সৈন্যদের রক্তের স্রোতের হোলি খেলায় উন্মত্ত হয়ে রয়েছে বর্মীরাজ বোদ মং ওয়েন এর সেনাবাহিনী।

আগ্রাসী বর্মীরাজের অনুগামী সেনাগণ স্বাধীন রাখাইন সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট মাহা থামাদা রাজাকে ধৃত করে নৃশংসভাবে হত্যা করার মাধ্যমে রাখাইন রাজধানী ম্রাও উ মহানগরকে পদানত করেই ক্ষান্ত হয় নাই। তারা রাখাইন সাম্রাজ্যের জনপদের পর জনপদ আগুন জ্বালিয়ে ভস্মিভুত করে দিয়ে রাখাইনদের ধন সম্পদ লুট করে নেয়। বর্মী বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ থেকে রাখাইন নারী পুরুষতো বটেই, দোলনায় দুলতে থাকা দুগ্ধ শিশু এমনকি লোলচর্ম অচল বয়োবৃদ্ধরাও রেহাই পায়নি।

খৃষ্টপূর্ব ৩৩২৫ অব্দে কালাদান নদীর দক্ষিণ তীরে ধান্যবতী নাম দিয়ে কুমার মারায়ু একটি নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের অধিবাসীগণ স্বধর্ম ও স্বকৃষ্টির প্রতি অত্যন্ত সুরক্ষিত করার একটা অনন্য প্রয়াস থাকায় এ জনগোষ্ঠীকে নাম রাখেন রাক্ষিতা বা রাখাইন। যা কালক্রমে রাখাইন < আরাখাইন < আরাকান হিসেবে পশ্চীমাদের নিকট পরিচিতি লাভ করে।

রাখাইনদের সুদীর্ঘ ইতিহাসের ধান্যবতী (ধান্যাওয়াদী), বৈশালী (ওয়েশালী), লেম্রো ও ম্রাও উ নামে চারটি শাসনকাল রয়েছে। সর্বশেষ রাখাইন সাম্রাজ্যের ধান্যাওয়াদী, রেম্মাওয়াদী, মেঘাওয়াদী এবং ধরা ওয়াদী নামে চারটি প্রশাসনিক প্রদেশ ছিল।

ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, খৃষ্টপূর্ব ৩৩২৫ অব্দ হতে ৩২৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ধান্যবতী শাসনামলে ১১০জন নৃপতি নিরবিচ্ছিন্নভাবে রাখাইন সাম্রাজ্য শাসন করেন। এ শাসনামলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো খৃষ্টপূর্ব ৫৮০ অব্দে রাজা চেন্দাসুরীয়া শাসনামলে মহামতি গৌতম বুদ্ধ রাখাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী ধান্যবতী নগরে আগমন ঘটে এবং মহামতি গৌতম বুদ্ধের উপস্থিতিতেই সবার শ্রদ্ধার জন্যে নবধাতু দিয়ে মহামুনি নামে একটি বৌদ্ধ মূর্তি নির্মাণ করা হয়।

৩২৭খৃষ্টাব্দ হতে ৮১৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বৈশালী শাসনামলে ১৩ জন রাখাইন নৃপতি রাখাইন সাম্রাজ্য শাসন করেন। ৮১৮ খৃষ্টাব্দ হতে ১৪০৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত লেম্রো শাসনামলে ৬১ জন রাখাইন নৃপতি এবং সর্বশেষ ১৪৩০ খৃষ্টাব্দ হতে ১৭৮৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ৪৯ জন রাখাইন নৃপতি রাখাইন সাম্রাজ্য শাসন করেন।

ইতিহাসের এ সুদীর্ঘ সময়ে রাখাইন ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ অর্থনীতিভাবেও চরম উন্নতি ঘটে। রন কৌশল এবং নৌ চালনায়ও বঙ্গোপসাগর উপকূলে একটি সমীহ জাগানিয়া নাম ছিল রাখাইন। একারণে দূধর্ষ মোগল, পর্তুগীজ, ইংরেজ, বর্মী এবং পাঠানরাও বঙ্গোপসাগরে রাখাইন বাহিনীকে পারত পক্ষে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করতো। তৎসত্ত্বেও ঙা কুছালা নামে রাজ পরিবারের এক কুলাঙ্গা সদস্য রাজ সিংহাসন দখলের লোভে বর্মীরাজা বোদ মংওয়েন (যিনি বর্মীদের নিকট বোদ ফায়া নামে পরিচিত) এর সাথে গোপন আতাঁত করে রাখাইন সাম্রাজ্য দখলের আমন্ত্রণ জানায়।

পরবর্তীতে ঙাকুছালা এর অনুগত বাহিনীর সহায়তায় বর্মীরাজ বোদ মঙ ওয়েন বিশাল বাহিনী নিয়ে অপ্রস্তুত রাখাইন সাম্রাজ্যের আক্রমণ করে সমগ্র রাখাইন সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। ১৭৮৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর রাত্রের রাখাইন সাম্রাজ্য দখলের পর পরই রাখাইন জাতির গর্ব, বৌদ্ধ সভ্যতার অমূল্যরত এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সর্বধিক পরিচিত মহামুনি বৌদ্ধ মূর্তিকে বর্মী যুবরাজের নের্তৃত্বে লুট করে নিয়ে যায়।

বর্মী বাহিনীর নির্বিচারের অত্যাচার নির্যাতন এবং ঙাছেনদে বাহিনীর অনাচার মধ্যেও রাখাইন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠে। প্রতিরোধকারীদের মধ্যে জাতাভিমান, জাতীয়তাবোধ এবং দেশপ্রেমের কোন ঘাটতি না থাকলেও তাদের মধ্যে সমম্বয়হীনতার কারণে সুশৃঙ্খল বর্মী বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ কার্যকর হয়ে উঠতে পারে নাই।

অন্যদিকে জাতীয় সংহতিতে এ ধরনের সীমাবদ্ধতাকে কাজের লাগিয়ে রাখাইনদের জাতীয়বাদী চেতনাকে ধবংস করে দেওয়ার উন্মাদনায় মেতে উঠে দখলদার বর্মী বাহিনী। রাখাইন ভূখন্ডে যত জ্ঞানী গুনী আছেন, তাঁদের অধিকাংশকে বার্মায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আর যাঁদেরকে নিয়ে যেতে সম্ভব হয়ে উঠে নাই তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

বুদ্ধিজীবিদেরকে নিধনের মাধ্যমে জাতির বিবেককে বিনাশ করে দেওয়াই ছিল বর্মীদের লক্ষ্য। বর্মীরাজ বাহিনীর কর্তৃক পরিচালিত নৃশংসতা কাহিনী বর্ণনাতীত। এসম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাদির মতে মাত্র চার বৎসরের (১৭৮৪ হতে ১৭৮৮) মধ্যে ২,৩৬,০০০ রাখাইনকে হত্য করা হয়। এসময় বর্মীরা রাখাইন জাতীয়তাবাদে পূণঃজাগরন চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেবার লক্ষ্যে প্রয়োজনের তুলনাও অধিক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

তারা রাখাইনপ্রের সাবেক রাজা আবায়া মাহারাজার পুত্র রাজকুমার পাটানপতি চেন রোয়ি পো, চেন্দাসুধেম্মারাজার পুত্র রাজকুমার ক্য জেন, ধেম্মারাইরাজার পুত্র রাজকুমার রীনাউ পতি, রাজকুমার থুদো উ এবং অন্যান্য রাজকুমার, রাজকুমারী, রাজ পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ বৌদ্ধ ধর্মীয় শাস্ত্রের মহাপন্ডিত সাই থং বিহারে প্রধান ধর্মগুরু রত চেন উ মহাথেরো, ঝিনা মেংঅং বিহারাধ্যক্ষ, লোকা মেংঅং বিহারাধ্যক্ষ, পিন্নে টং মহাথেরো, পুরোহিত রাজগুরু মহাথেরো, জ্যেতিষশাস্ত্রবিদ, চিকিৎসা শাস্ত্রবিদ, কাব্যতীর্থ, গণিতজ্ঞ, প্রকৌশলী, নগরপাল, সভাষদ ও অভিজাত শ্রেণীর প্রায় আট হাজার নারী পুরুষকে বন্দী করে বর্মায় নিয়ে যায়।

জোতিষশাস্ত্র, ত্রিপিটক, বিভিন্ন শাস্ত্র, সাহিত্যসমূহকেও জব্দ করে নিয়ে যাওয়া হয়। সমৃদ্ধশালী রাখাইন সাহিত্যের বিশাল ভান্ডারকে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করে দেওয়া হয়। ম্রো হং শহরে প্রখ্যাত বৌদ্ধ বিহারসমূহের মধ্যে ৩০টি বৃহৎ বিহার এবং তিন হাজার ৭০০টি ছোট বিহারকে আগুন জালিয়ে পুড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া রাখাইনপ্রের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত বহু প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ বিহার, চৈত্য, সীমাবিহারসমূহকেও বর্মীরাজের নির্দেশের ধ্বংস করা হয়।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল, রাখাইন নিদর্শন নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। রাজধানী ম্রোহং শহরসহ প্রাদেশিক শহর রেম্মাওয়াধি, মেঘাওয়াধি, ধরাওয়াধি নগরসমূহে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ সমূহ হতে মূল্যবান রত্নরাজী ও ধনসম্পদ লুন্ঠন করার পর অগ্নিসংযোগ করে দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে ভস্মীভুত হলে মাটি চাপা দিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা হয়।

বৌদ্ধ শাস্ত্রের মহাপন্ডিত ও জ্ঞানতাপস অতি জ্যেষ্ঠ বৌদ্ধ মহাথেরো মন্ডলীকে জোরপূর্বক শীলভ্রষ্ট করার মাধ্যমে ভিক্ষুত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। পরে অপেক্ষাকৃত কম বয়স্ক ও অনভিজ্ঞ বর্মী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তত্ত্বাবধানে পুনরায় ভিক্ষুত্ব গ্রহণের বাধ্য করে রাখাইন বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে মর্যাদাহানি করা হয়। এর সাথে রাখাইন সংস্কৃতি পরিবেশনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এধরনে ধ্বংসযজ্ঞ কার্যক্রমে সমপনান্তে পরবর্তী সময়ে বর্মী বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বর্মী সংস্কৃতিসেবীরা এসে রাখাইনদেরকে বর্মী সংস্কৃতি ধারায় জীবন যাপনের অভ্যস্ত করতে প্রচেষ্টা চালায়।

১৭৮৮ খৃষ্টাব্দের পর বর্মীরা বর্মী অধিকৃত রাখাইন রাজ্যের বর্মী আদলে বৌদ্ধ বিহার, চৈত্যসহ অন্যান্য স্থাপনাসমুহ নির্মাণ শুরু করে। ইতিহাসের সুদীর্ঘকাল ধরে বিকাশিত একটি সুসভ্য সংস্কৃতিকে নিচিহ্ন করে রাখাইন জাতির উপর সম্পূর্ণ একটি নতুন সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে একটি সুপ্রাচীন সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করার র্ববরোচিত হামলা চালানো হয়। রাখাইন জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার বর্মীদের বর্বর পরিকল্পনা এখনও শেষ হয় নাই।

র্বামায় সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির নের্তৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করতে সমর্থ হলেও রাখাইন ষ্টেটে তাঁরা গোহারা হেরে যায়। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে রাখাইন/আরকান ন্যাশনালিষ্ট পার্টি। ঐতিহাসিক শত্রু বর্মী নের্তৃত্বকে রাখাইন জনগণের লালিত ক্ষোভের বাহিঃ প্রকাশ ঘটে রাখাইন ষ্টেটে নির্বাচনে।

তবুও গণতন্ত্রের লেবাস নিয়ে বর্মী মসনদে আসীন হয়েই এ বর্মী গোষ্ঠী রাখাইনদের নিয়ে আবারও শত্রুতামূলক আচরণ করতে শুরু করে। গণতন্ত্রে সমস্ত নীতি, রেওয়াজ ও বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে তারা রাখাইন ষ্টেটে স্বৈরতন্ত্রে নতুন অধ্যায় সুচিত করে।

নির্বাচনে বিজয়ী রাখাইন/আরকান ন্যাশনালিষ্ট পাটিকে স্টেট সরকার গড়তে না দিয়ে অংসান সূচির লীগ ফর ডেমোক্রেসি দলটিই প্রাদেশিক সরকার গঠন করে রাখাইন জাতিকে ক্ষমতাহীন করা হয়। তাই ৩১ শে ডিসেম্বর রাখাইন জাতির জন্য একটি অভিশপ্ত দিন।

এতদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বসবাসরত রাখাইন জনগণ এদিনটিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে পালন করা হলেও বর্মী অধিকৃত রাখাইন দেশের রাখাইন জনগণ এদিনকে স্মরণ করে শুধু বোবা কান্না আর দীর্ঘ শ্বাসই ফেলেছে। প্রকাশ্যে কিছুই করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে গত কয়েক বছর ধরে সীমিত আকারে হলেও বর্মাদেশের (অধুনা মায়ানমার) রাখাইনগণ প্রকাশ্যে দিবসটি পালন করতে শুরু করেছে।

লেখক : ক্য থিং অং, কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ।

লেখাটি গত বছর লিখেছিলেন ক্য থিং অং। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলা ডট রিপোর্টের পাঠকদের জন্য আবারও প্রকাশ করা হলো।

আপনার মন্তব্য