বাংলা ডেস্ক

অন্যকে জানাতে পারেন:

burma_indians
রোহিঙ্গাদের মতো ভারতীয়দেরও ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ এর দশকের মধ্যে মিয়ানমার থেকে বিতাড়ন করা হয়। ছবি : স্ক্রল

১৮৫৫ সালে মিয়ানমারের কিছু এলাকা ভারতীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় ইংরেজরা। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ ভ্রমণ কালে হেনরি ইউলে নামের এক সরকারি কর্মকর্তা এসব বিষেয় লিখেছিলেন। তৎকালীন বার্মাকে নিয়ে চিত্তাকর্ষক সেই বর্ণনায় ইউলে লিখেছিলেন, বার্মিজরা তাদের গায়ের রং তুলনামূলক সাদা হওয়ায় পূর্ব দিকের প্রতিবেশীদের চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করতো।

ইউলে লিখেছেন, ‘বার্মিজরা কোনো এক অদ্ভুত কারণে নিজেদেরকে সাদা মানুষ বলে দাবি করতো। এবং অবাক করা বিষয় হলো তারা এখনও সেরকমই মনে করে। অন্যদিকে বাঙ্গালীরাও পরোক্ষভাবে সেটা মেনে নয়। তাদের দেশে আমাদের কর্মচারিরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলতো তখন তাদেরকে কালা আদমি বা কালো মানুষ হিসেবে সম্বোধন করতো। অন্যদিকে চীনের এলাকা থেকে আসা বার্মিজ কোলাদেরকে বিদেশি হিসেবে মনে করতো তারা।’

‘কালা’ নিয়ে এই বর্ণনা সম্ভবত বার্মায় প্রথম জাতিগত বৈষম্য (বর্ণবাদী) নিয়ে লিখিত কোনো দলিল। যাহোক, পরে সমগ্র বার্মাকে ভারতীয় সম্রাজ্যভুক্ত করে নেয় ব্রিটিশ সরকার। তখন আস্তে আস্তে এ অঞ্চলে ভারতীয়রা প্রবেশ করতে থাকে। আর স্থানীয় বার্মিজরা প্রায়ই তাদের ‘কালা’ হিসেবে সম্বোধন করতো।

বর্তমানে সেখানে খুব অল্পসংখ্যক ভারতীয়ই আছে যাদেরকে ব্রিটিশ সাম্রাজের সময় যাওয়া ভারতীয় বলে চেনা যায়। কিন্তু সেখানে ‘কালা’ শব্দটির ব্যবহার এখনও বিরাজমান। যেটার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বার্মার পশ্চিম উপকূলে মুসলমান সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা। যাদেরকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সম্প্রদায় হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গা ও ভারতীয়দের ক্ষেত্রে এই গালিটা একইরকমভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের মতো ভারতীয়দেরও ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ এর দশকের মধ্যে দেশটি থেকে বিতাড়ন করা হয়। আর মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি আজও চলছে। যারা দেশের মধ্যে বিদেশি হিসেবে বিবেচিত।

বাদামী বার্মা

১৮২৬ সালে প্রথম অ্যাঙ্গলো-বার্মা যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়লাভ করলে বর্তমান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (আসাম, মণিপুর, কেশর, জয়ন্তিয়া ও আরাকানের কিছু অংশ ) ব্রিটিশ রাজ শাসনের অধীনে চলে আসে। যা আধুনিক বার্মার অংশ। তারপর থেকেই ভারতীয়রা বার্মায় যেতে শুরু করে। একপর্যায়ে ১৮৮৫ সালে পুরো বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়।

বার্মায় ভারতীয়দের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে। ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশ হিসেবে বার্মায় ভারতীয়রা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। বিশেষ করে চাটিয়ার, মারোয়ারি ও গুজরাটি সম্প্রদায়ের বড়ো বড়ো বণিকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায়। পরে সেখানে বাঙালি বাবুদেরও আগমন ঘটে। বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের মানুষজন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সহযোগী হিসেবে সেখানে যায়। তারা ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে (মিয়ানমারের ডেল্টা পর্যন্ত) তাদের কার্যক্রম বাড়াতে থাকে। ওই সময়ের প্রখ্যাত বার্মিজ বাঙালিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বার্মায় তখন দেবদাস উপন্যাসের লেখক শরৎচন্দ্র ব্রিটিশ সরকারে কেরানি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সবচেয়ে বেশি মানুষ ভারত থেকে শ্রমিক হিসেবে বার্মায় গিয়েছিলো। তারা সেখানে কুলি, ভৃত্যের কাজ করতো।

১৯৩১ সালে এসে বার্মার মোট জনসংখ্যার ৭ ভাগই দাঁড়ায় ভারতীয়। এরাই দেশটির অর্থনীতির বড়ো অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো। ১৯৩০-এর দশকে ভারতীয়রা বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনের ৫৫ ভাগ কর প্রদান করতো। যেখানে স্থানীয় বার্মিজরা মাত্র ১১ ভাগ কর প্রদান করতো।

ওই সময় বার্মায় যে অভিবাসন ঘটে ঠিক একই ধরনের অভিবাসন ঘটতে শুরু করে গত কয়েক দশক ধরে। বার্মার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে চলে আসছে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম জেলায়। সম্প্রতি এই অভিবাসন ভয়াবহভাবে ঘটছে, কারণ এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমার রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের বাঙালি উল্লেখ করে ওই ভূখণ্ড ছাড়তে তাদের ওপর এই সহিংসতা চালাচ্ছে। রাষ্ট্রটি তাদের নাগরিকত্ব দেয় জন্ম সূত্রে নয়, জাতি সূত্রে। রোহিঙ্গাদের যেহেতু মিয়ানমার নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না, তাই মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করলেও রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব পায় না।

মিয়ানমারে ভারতবিরোধী মনোভাব

১৯৩০ সালে মিয়ানমারের রেঙ্গুনে তেলেগু ও বার্মিজ বন্দরকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, সেই সময় মিয়ানমারে ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রথম প্রকাশ্যে আসে। আজকে রোহিঙ্গাদের ওপর যে জাতিগত নিধন চালানো হচ্ছে, বলা যায় সেটা ওই সময়েরই ধারাবাহিকতার ফল। ১৯৩৭ সালে বার্মা ব্রিটিশ ভারত থেকে পৃথক হলে (যদিও তখনো ব্রিটিশদের অধীনেই ছিলো বার্মা) পরের বছরই বড়ো আকারে বার্মিজ ও ভারতীয়দের মধ্যে দাঙ্গা হয়, ভারত-বিরোধী মনোভাব একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। ওই সময় জাতিগত এই বিদ্বেষ ধর্মীয় বিদ্বেষে রূপ নেয়, যখন এক মুসলিম লেখক বুদ্ধের সমালোচনা করে একটি বই লেখেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারে ভারতীয় সব জাতিগোষ্ঠীই সহিংসতার শিকার হতে থাকে।

১৯৪১ সালে মিয়ানমারে আরো সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বার্মা আক্রমণ করে। জাপানিরা বার্মা থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে উঠেপড়ে লাগে। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনারা যখনই ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হতো, তখনই তারা জাপান ও স্থানীয় বার্মিজদের দ্বারা আক্রান্ত হতো। এর ফলে ওই সময় প্রথম ভারতীয়দের বড়ো একটা অংশ মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হয়। তখন মিয়ানমার থেকে ভারতবর্ষে ক্রান্তিয় বণাঞ্চল পার হয়ে আসার পথে হাজার হাজার ভারতীয় মারা পড়তো।

প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ

ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করার পর রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার জাতিগত স্বকীয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে বর্ণবাদী নীতি গ্রহণ করে। ফলে সেখানে থাকা ভারতীয়রা বিভিন্ন সময়েই জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যেখানে মিয়ানমারে ১০ লাখেরও বেশি ভারতীয় ছিলো, ১৯৫০-এর মাঝামাঝি সেই সংখ্যা সাত লাখে নেমে আসে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত দেশটিতে বংশানুক্রমে বাস করা দেড় লাখ ভারতীয় নাগরিকত্বের আবেদন করলেও এর পাঁচ ভাগের এক ভাগ আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি।

এরপর ১৯৬২ সালে এসে সেনাবাহিনী মিয়ানমারের শাসনভার গ্রহণ করে। সেসময় দেশের প্রায় সবগুলো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীই সামরিক শাসক নি উইনের আগ্রাসী বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়। তাদের সমস্ত সম্পদ সরকারি করে নেওয়া হয়। এতে বিশেষ করে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা বেশি ক্ষতির  মুখে পড়ে। সেখানকার ভারতীয় কর্মকর্তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। ১৯৬২ থেকে ৬৪—এই দুই বছরে তিন লাখের বেশি ভারতীয়দের মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করা হয়।

১৯৮২-তে মিয়ানমার নতুন নাগরিকত্ব আইন পাস করে, যেটাতে নির্দিষ্ট জাতিসত্ত্বার ওপর ভিত্তি করে নাগরিকত্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই আইন অনুসারে রোহিঙ্গা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত অধিকাংশ মানুষই নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তারা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রহীন।  যদিও বর্তমানে গণহত্যার শিকার হওয়া রোহিঙ্গারাই শুধু সারাবিশ্বের সহানুভূতি পাচ্ছে, সেখানে কিন্তু প্রচুর ভারতীয়ও একই রকম নাগরিক সুবিধাহীন অবস্থায় রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশটিতে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করার পরও রাষ্ট্রহীন হয়ে আছে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ভারতীয়।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

তখন থেকেই শুধু মিয়ানমারে টিকে থাকার জন্য প্রচুর ভারতীয়কে বার্মিজ সংস্কৃতি গহণ করতে হয়েছে। দেশটির সরকারি নীতি ছিলো, অভিবাসীদের বার্মিজ করে তোলা—ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতিসহ যেসব বিষয়ে ভিন্নতা ছিলো সেগুলোকে দূর করে পুরোপুরি বার্মিজ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের তাদের নিজস্ব ভাষা ছেড়ে বার্মিজ ভাষা রপ্ত করতে হয়, এমনকি তাদের নামও বার্মিজ ভাষায় রাখতে বাধ্য করা হয়। শুধু এতেই ক্ষান্ত হয়নি মিয়ানমার সরকার। সেখানকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দু ও মুসলমানরা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান গণউদযাপন করতে পারে না।

আর মিয়ানমারে বসবাসরত ভারতীয়রা সাংস্কৃতিক গোঁড়ামি ও দেশ থেকে বহিষ্কৃত হলেও, তাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৬০ সালে ভারত সরকারও সমালোচনার শিকার হয়। উল্টোদিকে চীন কিন্তু ঠিকই মিয়ানমারে অভিবাসী চাইনিজদের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিলো।

এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে, একসময় ভারতীয়রা যে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো, বর্তমানে রোহিঙ্গারা সেই একই বর্ণবৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গতবছর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়া রোহিঙ্গা ও সেনাবিহনীর মধ্যে ঘটা সর্বশেষ সহিংসতার পর থেকে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। যাদের অধিকাংশই শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে।

এমন পরিস্থিতিতে ভারত সরকার সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে, দেশটিতে অল্প যে কজন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা বলছে। যেখানে গিয়ে তাদেরকেও হয়তো গণহত্যার শিকার হতে হবে।

স্ক্রল ডট ইন-এ প্রকাশিত শোয়েব ড্যানিয়েলের প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তর করেছেন ইব্রাহিম খলিল

আপনার মন্তব্য