নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

sha abdul karim
ছবি: সংগৃহীত

‘যাবার কালে প্রাণ বন্ধু নয়ন তুলে চাইলো না ... আসি বলে গেলো বন্ধু আইলো না’। শেষ পর্যন্ত প্রাণ বন্ধু এসেছিলো কিনা জানি না। প্রাণের বন্ধুকে না পাওয়ার যে বদনা সেটা অপূর্ণই থেকে গিয়েছিলো কি না তাও তিনি বলে যাননি। কিন্তু সুরের মাধ্যমে তিনি তার হৃদয়ের সেই শূন্যতা বা পাওয়া না পাওয়ার যে কথা বলেগেছেন সেটার জন্য তিনি অবিনশ্বর। এক অপার্থিব সুরের কারিগর ছিলেন তিনি। সারাটা জীবন তিনি গানে গানে সাধনা করে গেছেন। গানই ছিলো তার ধ্যান জ্ঞান প্রেম ভালোবাসার এক মাত্র প্রকাশ মাধ্যম। শুধু বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে নয়, মানুষের হৃদয়ের বন্দি আকুতিগুলোকে প্রকাশের মুক্তি দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন বাউল সম্রাট। বাউল গানের এই কিংবদন্তী সাধকের নাম শাহ আবদুল করিম। 

২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এই দিনে ৯৩ বছর বয়সে জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেন তিনি। আজ এই মহান সাধকের মৃত্যু দিন। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা শাহ আবদুল করিমের জন্ম সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে। তাঁর বাবার নাম ইব্রাহিম আলী, মা নাইওর জান বিবি। বাবা-মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র ছেলে সন্তান। প্রায় দেড় হাজার গান লিখে গেছেন তিনি, যার অধিকাংশ দেশে-বিদেশে জনপ্রিয়। 

সহজ ভাষায় সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। তাঁর গানের রাজ্যে তিনি একক অধিপতি। এই বাউল সাধক শুধু গানেই নয় জীবন যাপনেও ছিলেন সৎ নির্লোভী। এ নিয়ে তার সম্পর্কে নানা ধরনের কথাও প্রচলিত আছে । প্রচলিত আছে শেষ বয়সে  এসে বার্ধক্যে জর্জরিত শাহ আব্দুল করিম কানে একটু কম শুনতেন। তো একবার এক সন্মাননা অনুষ্ঠানে তাকে পদকের পাশাপাশি নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। তখন মাইকে ঘোষণা এলো তাকে নগদ ৩ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। তখন তার পাশে বসা একমাত্র ছেলে নূর জালাল বাবুলকে বলেন, তিন হাজার টাকা! তখন তাঁকে জানানো হয়, তিন হাজার নয়, তিন লাখ টাকা। শাহ আব্দুল করিম টাকার অংক শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, তিন লাখ! এত টাকা দিয়ে আমার কী করবো! এই বাবুল চল, বাড়ি যাই ... বলে বাউলসম্রাট বাড়ির দিকে রওনা দেন’

এমন নানা ধরনের গল্প প্রচলিত আছে এই বাউল সাধককে নিয়ে। পুরস্কার অর্থ জীবনের যান্ত্রিক লোভ মোহর পেছনে ছোটেন নি কখনো। শুধু গানের পিছনেই ছুটেছেন সারাটা জীবন। বিনয়ী এই মানুষটি এক স্বাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘কত ভুল করেছি চলার পথে। ... পদে পদে ভুল, কিন্তু গান নিয়া ভুল করি নাই। এই গানের মাঝেই মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি ...।’ 

তার কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেলো একুশে পদক গ্রহণের মঞ্চেও। তিনি যখন একুশে পদক পেলেন তখন বলেছিলেন, আমার পুরস্কারতো আমি অনেক আগেই পেয়েছি। তখন জানতে চাওয়া হলো কোথায়? তিনি বলেন, আমার যৌবন কালে কৃষকদের সম্মেলনে মাওলানা ভাসানী আমার পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, তুই মানুষের শিল্পী।

তার গানের ভেতরও সন্ধান মেলে জীবনের অফুরান ভালোবাসা দর্শন বোধ। লোভ-মোহের জগতে মত্ত থাকা মানব মনকে তিনি যেন তার গানে স্মরন করিয়ে দিতেই গেয়ে ছিলেন-

‘ভব সাগরের নাইয়া/ মিছা গৌরব করো রে পরার ধন লইয়া/ একদিন তুমি যাইতে হবে এই সমস্ত থইয়া রে/ পরার ধন লইয়া ’

আপনার মন্তব্য