নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

রোহিঙ্গাদের এই ছবিটি সংগৃহীত

ভিটে মাটি ছেড়ে মাইন পোতা বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটছেন তারা। কেউ নেই পাশে। সেনা নির্যাতনের মুখে কোলের শিশু সন্তানটিকেও ফেলে আসতে হয়েছে কারো। কেউ বা কবর দিয়ে এসেছেন শিশু-স্বামী কিংবা রক্তের স্বজন। কেউ আবার সে সুযোগটুকুও পায়নি। দরিদ্র দূর্বল যে নারী তার নিজের শরীরটাকেই টেনে আনতে কষ্ট হয় এই দূর্গম পথ ধরে সে ক্ষুধার্থ পেটে কাঁধে তুলে নিয়েছেন ২/৩ জন শিশুকে। তাকে হেঁটে বেড়াতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল, দিনের পর দিন।

গণ্যমাধ্যম জুড়ে এখন কেবলই এমন সংবাদের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদ কর্মীরা নিজেরাও ভুগছেন বিষণ্নতায়। ভারাক্লান্ত মন নিয়ে নিজেদের অনুভূতি জানাতে গিয়ে অনেকেই অবষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। নিজ চোখে দেখা রোহিঙ্গাদের শরণার্থী জীবনকে অমানবিক বলে বর্ণনা করছেন তারা। ছবি তুলতে গিয়ে কেঁপে উঠছে মানবিক হৃদয়। ক্ষুধার্থ শিশুদের যে চাহনি আহাজারী, সন্তান হারা মায়ের কান্না, স্বজনের লাশ ফেলে ছুটে আসা মানুষগুলো বর্ডার পার হতে পারলেই নাম হয়ে যায় শরণার্থী। আর যারা পারেনা তারা থাকে বাঙ্গালী সন্ত্রাসী উপাধি নিয়ে সেনা নির্যাতনের মুখে। ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অমানবিক জীবন যাপনের কথা বর্ণনা করছেন এইসব সাংবাদিকরা।

রোহিঙ্গাদের প্রিয় ভিটেমাটি স্বজন পরিচয় সব কিছু ফিকে হয়ে যায় এইসব সীমান্তের বেড়াজালে এসে । জাতীয়তা ভূমি প্রেম সংসার সীমান্তের ওই পারে রেখে এসে তারা এখন শরণার্থী। বাংলাদেশ সিমান্তে আশ্রয় নিতে পারলেও বেঁচে থাকা এখন কষ্টকর হয়ে উঠছে। এতো মানুষের জন্য খাদ্য চিকিৎসা বাসস্থান ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের। আন্তজার্তিক ত্রাণ সংস্থাগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। এদিকে রবিবার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন রেজু আমতলি ও তুমব্রু সীমান্তে মাইন বিস্ফোরনে ৩ রাখাইন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

৭১ টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার হোসাইন সোহেল বলেন, “লক্ষাধিক শিশু খোলা আকাশের নিচে। এমন দৃশ্য দেখে ঠিক থাকা যায় না। ঢাকায় বসে গরম চায়ের পেয়ালা মুখে মানবিক এসব দৃশ্যের যোগ বিয়োগের হিসেব মিলানো সহসায় কারও ভুল হতে পারে। এ পর্যন্ত পাচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার প্রবেশ ঘটেছে যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাটা বেশি। তবে কতো তা এখনও জানা যায়নি।”

ফটো সাংবাদিক সৈয়দ জাকির হোসেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছবি তুলতে গিয়ে বিবিসিকে জানিয়েছেন "স্বাভাবিকভাবেই তারা বাকরুদ্ধ। তারা ওভাবে বলতেও পারেনা। বাচ্চাকে ফেলে রেখে চলে এসেছে মা, সেই মা কিভাবে তার মনোভাব প্রকাশ করবে। সত্যিকার অর্থে এটা একটা প্রচণ্ড মানবিক বিপর্যয় যাকে বলে আর কি। তাদের যে অসহায়ত্ব সেটা এতো স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় যে কষ্ট লাগে।’’

 শরীফ সারোয়ারের তোলা ছবিটি সাংবাদিক হোসাইন সোহেলের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া

এই দূর্দশার মধ্যেই বৃষ্টি ডেকে এনে আরেক দূর্যোগ। বৃষ্টি মাথায় করেই ভিজতে ভিজতে মাইলের পর মাইল মায়ের হাত ধরে হাটছে শিশুরা। সীমান্তে পার হওয়া মানুষগুলোর মুখ থেকে এই সব দূর্দশার করুন গল্প শুনতে গিয়ে অনেকেই এর ভয়াবহতা আতকে ওঠেন। আর আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা যখন বর্ণনা করে তাদের লোমহর্ষক নির্যাতনের খবর তখন অনেকেই শিউরে ওঠেন।

বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আমানুর রহমান ঘটনা বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে জানালেন, সংবাদ সংগ্রহে এসে তিনি দেখেছেন এখানকার মানুষ কতটা অমানবিক জীবন যাপন করছে। তিনি বলেন, “ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে অনেকেই রাস্তায়, জঙ্গলে খোলা আকাশের নিচে। এ এক অমানবিক দৃশ্য। নারী শিশুরা ভিজছে। ত্রাণ সহায়তা আসলেও তা পর্যাপ্ত না। মানুষ হিসেবে মানুষের এমন কষ্ট দেখাটা সত্যিই যান্ত্রনার।”

সদ্য জন্মদেয়া এক নব জাতকের মায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, গর্ভে সন্তান নিয়ে ১৩ দিন পায়ে হেটে তিনি সিমান্ত পারি দিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া পৌছেছেন। ভাবতে পারেন কি করুন অবস্থা। অবশেষে সেই শিশুটির জন্ম হয়। তবে জীবনের যন্ত্রনায় দুই দিনেও নাম রাখেননি মা। সেই ভাবনার সুযোগ তার হয়নি! আমানুর রহমান শরাণার্থী ক্যাম্পে থাকা সেই শিশুটির নাম রেখেছেন আয়েশা সিদ্দিকা।

মার্কিন গণমাধ্যম পিবিসি নিউজ আওয়ার এর সাংবাদিক তানিয়া রশিদ বর্তমানে বাংলাদেশে আছেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। তিনি বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তে ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করছেন।  

তানিয়া রশিদ লিখেছেন,  “মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী জীবন বাঁচাতে পায়ে হেঁটে পালিয়ে আসছে। কেউ কেউ হেঁটেছে টানা ১৫ দিন। বাংলাদেশ এসব শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সব মিলে টেকনাফে এক অদ্ভত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে পর্যাপ্ত খাবার, পানি এমনকি থাকার ব্যবস্থাও নেই। নিবন্ধিত ক্যাম্পগুলো অনেক আগেই শরণার্থী দিয়ে ভরে গেছে। কেউ কেউ কোনো রকমরকম অস্থায়ী থাকার জায়গা করতে পারলেও বেশিরভাগ রোহিঙ্গা শরণার্থীকেই ঘুমাতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। তাদের তীব্র বৃষ্টিতেও মিলছে না মাথা গোজার ঠাঁই। তারা প্রচণ্ড দুর্বল, ক্ষুধার্থ এবং ক্লান্ত। সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে তাদের অনেক সাহায্যের প্রয়োজন।”

আপনার মন্তব্য