নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

toha-tahura
হাসপাতাল থেকে বিদায় জানানোর আগে তোহা-তাহুরা, ছবি: সংগৃহীত

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে আলাদা জীবন পাওয়া তোহা-তাহুরা। রোববার বিকেল তিনটার দিকে ঢামেক হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তারা গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এক মাস আগে অপারেশনের মাধ্যমে তাদের আলাদা করা হয়।

এদিকে তোহা-তাহুরাকে বিদায় জানাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল সভাকক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

এসময় মন্ত্রী তোফা-তহুরার ছাড়পত্র তাদের বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসময় তহুরাকে কোলে তুলে নেন। আদরও করেন। 

রাজু মিয়া ও সাহিদা বেগম দম্পতির হাতে শিশু দুইটিকে তুলে দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ভালো থাকুক তোফা ও তহুরা। সুখী ও সমৃদ্ধশালী পরিবারের সন্তান হিসেবে তারা বেড়ে উঠুক। মা-বাবা মেয়েদের চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। প্রার্থনা করি তোফা ও তহুরা বড় হয়ে দেশের সেবায় যেন অবদান রাখতে পারে।’ তোফা ও তহুরার বাবা রাজু মিয়াকেও সরকারি চাকরির আশ্বাস দেন মন্ত্রী। একইসঙ্গে মন্ত্রী তাদের বাবার হাতে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে দেন।

জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তোফা ও তহুরাকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অভিনন্দন জানান মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, ‘শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসকরা একটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করায় তাদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। চিকিৎসকরা প্রমাণ করেছেন, ঐকান্তিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে সীমবদ্ধতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এর আগের মাগুরায় মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়া, বৃক্ষমানব আবুল বাজনদার, বিরল রোগে আক্রান্ত মুক্তামনির চিকিৎসায় চিকিৎসকরা সাফল্য দেখিয়েছেন। এসব ঘটনায় চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশগামীতা কমবে। দেশের মেধাবী ও দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে মানুষ সেবা গ্রহণে আস্থা পাবে।’

সংবাদ সম্মেলনে শিশু দুইটির চিকিৎসার তত্ত্বাবধানে থাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, ‘তোফা ও তহুরা ভালো আছে। তারা স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারছেন। তোফা বসতে শুরু করেছে। তহুরা একটু শান্ত প্রকৃতির। দুই বোনই পরষ্পরের দিকে তাকাচ্ছে। হাতে খেলনা নিয়ে খেলছেন, হাসছেন। চিকিৎসক হিসেবে এমন দৃশ্য দেখতে পারা সত্যই আনন্দের, গর্বের।’

আগামী ছয় মাস পর তাদের আবারও অস্ত্রোপচার করা হবে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, ‘আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের বয়স ১ বছর পূর্ণ হবে। অস্ত্রোপচার করে আলাদা করার পাশাপাশি তাদের দু‘জনেরই মলত্যাগের জন্য অস্থায়ী মলদ্বার তৈরি করা হয়েছে। তাদের আরও ২ থেকে ৩টি অস্ত্রোপচার করতে হবে। ৬ মাস পর অস্ত্রোপচার করে মলদ্বারের রাস্তা বের করা হবে। ওই অস্ত্রোপচারে দুই মাস পর অস্থায়ীমলদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হবে। ধকল কাটিয়ে উঠতে সময় নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হবে।’

তোফা ও তহুরাকে পুণর্বাসনের আহ্বানের জানিয়ে ডা. সাহনূর ইসলাম বলেন, ‘তাদের বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। চিকিৎসা পরবর্তী তাদের পুনর্বাসন প্রয়োজন। এজন্য ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহায়তা করেছে। সবাই মিলে সহায়তার হাত বাড়ালে তোফা ও তহুরাকে উন্নতমানের জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখায় তোফা ও তহুরার নামে একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়েছে। হিসাব নম্বর ১৩৯১৫১৭৩৭৪০। সামর্থ্যবান আগ্রহী ব্যক্তিদের এই নম্বরে অর্থ দান করার আহ্বান জানান তিনি।

গত ১ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালে জোড়া লাগা যমজ শিশু তোফা ও তহুরাকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা হয়। অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়া কয়েকজন চিকিৎসক জানান, অপারেশন থিয়েটারে প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করে তাদের আলাদা করা হয়। এরপর দুইটি আলাদা অপারেশন থিয়েটারে রেখে চিকিৎসকরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে তাদের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।

জন্মের পর থেকে তোফা ও তহুরা জোড়া লাগা অবস্থায় ১০ মাস একসঙ্গে বড় হয়েছে। তাদের পিঠের কাছ থেকে কোমরের নিচ পর্যন্ত পরষ্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দূ’জনের পায়ুপথও ছিল অভিন্ন। তবে মাথা, হাত, পা পৃথক ছিল।

তোফা ও তহুরা যেভাবে জোড়া লাগানো ছিল, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে পাইগোপেগাস বলা হয়। চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশের ইতিহামে ‘পাইগোপেগা’ শিশু পৃথক করার ঘটনা এটি প্রথম। এর আগে অন্যান্য হাসপাতালে তিন জোড়া শিশুকে পৃথক করা হলেও তাদের ধরণ আলাদা ছিল।

আপনার মন্তব্য