অন্যকে জানাতে পারেন:

myanmar
ছবি: সংগৃহীত

আলতাফ পারভেজ


আরাকানের সর্বশেষ ঘটনাবলী সমগ্র বিশ্বে, বিশেষ করে অং সান সুচির পুরানো মিত্র ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যাপক কাভারেজ পেল এই সপ্তাহে। অনিচ্ছা সত্ত্বে হলেও বাংলাদেশ এই ইস্যুতে এখন একটা পক্ষ। ঠিক অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে ১৯৭৭ পরবর্তী সময়ে। কিন্তু সে যাত্রায় ফল হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বর্মা সেসময় বাংলাদেশ মিলিটারি এটাশেকে বহিষ্কার করে এবং কয়েক মাস পরেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আরাকানে ‘নাগা-মিন’ (ড্রাগন কিং) অপারেশন শুরু করে। প্রায় দুই লাখ রোহিংগা সেসময় গ্রেফতার এড়াতে বাংলাদেশে চলে আসে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অনেকেই এখনো স্বল্পস্থায়ী সামরিক উত্তেজনাময় সেসব দিনের কথা স্মরণ করতে পারেন। 

সেসময়কার জিয়াউর রহমান সরকারের একটা বড় সফলতা ছিল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘকে ঢাকা ও রোহিংগাদের যৌক্তিক অবস্থান বোঝাতে পারা এবং বাংলাদেশের পাশে রাখতে পারা। ফলস্বরূপ জেনারেল নে উইন-এর `সোশালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি’র সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৭৮-এর ৯ জুলাই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। ঢাকার পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব তবারক হোসেন ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।

দুই.
জায়গার অভাবে আমি এখানে কেবল চুক্তিপত্রটির প্রথম ও শেষ অংশের ছবি দিয়েছি ( লেখার শুরুতে এবং শেষে)--কিন্তু এই চুক্তিপত্রের ঐতিহাসিক মূল্য হলো--এতে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিংগা শরণার্থীদের বর্মা তার নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হয়েছিল এবং ১৯৭৮-এর ১ আগস্ট থেকে পরবর্তী ছয় মাস ধরে সেই সব শরণার্থীরা আরাকানে ফেরতও যায়। এই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্যই বার্মা সরকার সেসময় তার বিখ্যাত ‘হিন্থা প্রজেক্ট’ ( Hintha Project ) গ্রহণ করে। আর বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. শামসুল হক সেই পুনর্বাসন কার্যক্রম দেখতে ১৯৭৯-এর ২৩ জানুয়ারি বর্মা সফর করেছিলেন। (এই চুক্তি এবং রোহিংগাদের সফল পুনর্বাসন নিয়ে সেসময়কার একটা ব্রিটিশ নথির কিয়দংশও এখানে তুলে ধরা হলো।) 

তিন.
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ১৯৯১ সালে এসে নে উইন পরবর্তী বার্মার নতুন সামরিক সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে পূর্বতন রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা ও চুক্তি থেকে সরে আসে এবং আরাকানে আবারও পীড়ন শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় আবার কক্সবাজার ও বান্দরবানে শরণার্থী আসা শুরু হয় এবং সেই ধারা অব্যাহত আছে আজো। লক্ষ্যণীয়, বর্তমানে বর্মার সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি অং সান সুচির এনএলডি সরকারও দেশে-বিদেশে রোহিংগাদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে উল্লেখের সময় বেমালুম চেপে যায় যে, ১৯৭৯ সালে এই মানুষদেরই বর্মা তাদের নাগরিক হিসেবে আঞ্চলিক চুক্তির মধ্যদিয়ে পুনর্বাসন করেছিল। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, বাংলাদেশ নিজেও এমুহূর্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৯৭৮-৭৯ এর দ্বিপক্ষীয় ঐতিহাসিক চুক্তিটির কথা তুলে ধরছে না। জিয়াউর রহমান সরকার করেছেন বলে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বাংলাদেশের ফায়দা হাসিল না করার চলতি অভিজ্ঞতা বিস্ময়কর। অথচ রোহিংগাদের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমের সহানুভূতির মুখে তবারক হোসেন এবং উ থিন ওং (বর্মার তখনকার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী)-এর চুক্তিটি আজকে বাংলাদেশকে লাখ লাখ শরণার্থী ধারণের বিপদ থেকে রেহাই দিতে পারতো।

লেখক : গবেষক

আপনার মন্তব্য