বিনোদন প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

Mustafa Sarwar Farooqi
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, ছবি: সংগৃহীত

মঞ্চের পারফরম্যান্স যখন হৃদয়কে নাড়া দেয় তখন সেই ছোট মঞ্চই হয়ে ওঠে বিশাল আকাশ আর চরিত্রেরা তার নক্ষত্র। শিল্প কলায় প্রদর্শীত হচ্ছে বানভাসি মানুষের সাহায্যার্থে নাটক ‘রিজওয়ান’। ইতোমধ্যেই প্রখ্যাত নির্দেশক জামিল আহমেদের রিজওয়ান সাড়া ফেলে দিয়েছে নাট্যপ্রেমীদের মাঝে। এর ক্রমেই যেন বিস্তৃত হচ্ছে রিজওয়ান’র দর্শক পরিধি। আলোচিত হয়ে ওঠা রিজওয়ান দেখতে মঞ্চের নিয়মিত দর্শকদের পাশাপাশি চলে আসছেন ভিজুয়াল দর্শকরাও। রিজওয়ানে মুগ্ধ হয়ে লিখছেন সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও।

জনপ্রিয় নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও তার মুগ্ধতা চাপিয়ে রাখতে পারেননি এই প্রদর্শনী দেখে। নাটকটি শেষ করে লিখেছেন রিজয়ান সম্পর্কে। তিনি রিজয়ানকে ‘ম্যাজিক’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। ফারুকী তার দীর্ঘ স্টাটাসে উল্লেখ করেছেন-

‘আমার এই লেখা কোনো প্রচলিত অর্থে রিভিউ না। কিন্তু "রিজওয়ান" দেখে আসার পর কিছু কথা না বলে থাকতে পারতেছিনা।’

তার ফেসবুক স্টাটাসটি হবহু তুলে ধরা হলো- ‘আগেই জানা ছিলো জামিল আহমেদ চেনা কোনো জগৎ নির্মাণ করবেন না। প্রতিদিনের ডাল-ভাত উনি সার্ভ করবেন না।

এটা এক ডেভেস্টেটিং এক্সপেরিয়েন্স, রিভেটিং জার্নি। যে জার্নির শুরুর দশ-বিশ মিনিট পর্যন্ত আমি নিশ্চিত ছিলাম না আমি কি এটা পছন্দ করছি নাকি না। কিন্তু এক পর্যায়ে পছন্দ-অপছন্দের ভাবনা ছাড়ায়ে আমি নিজেরে আবিষ্কার করলাম কাশ্মীরের ঐ মানুষগুলার সাথে একই কাতারে যেখানে জীবন আর মৃত্যু গুলিয়ে গেছে কবিতার মতো।

আমার এই লেখা কোনো প্রচলিত অর্থে রিভিউ না। কিন্তু "রিজওয়ান" দেখে আসার পর কিছু কথা না বলে থাকতে পারতেছিনা।

আগেও বলছি, নব্বই দশকের শুরুতে করা "বিষাদ সিন্ধু" দিয়ে জামিল আহমেদ বাংলাদেশের থিয়েটারের নতুন চোখ খুলে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে বাংলাদেশে হওয়া আমাদের বেশির ভাগ থিয়েটার প্রযোজনাই মোটামুটি কোনো না কোনো ভাবে বিষাদ- সিন্ধু দ্বারা ইন্সপায়ার্ড। হয় সেটে, নয় আলোতে, নয় কোরিওগ্রাফি, নয় পোষাক। কিন্তু আপনি এটা খুব বেশি শুনবেন না, কারণ যে যে সব রাজনীতির মধ্যে থাকলে ইতিহাস বা মিডিয়া এগুলারে লিপিবদ্ধ করে, জামিল আহমেদের বসবাস এসবের বাইরে।

"রিজওয়ান"-য়ে জামিল আহমেদ এক বিমূর্ত রাজনৈতিক কবিতা রচনা করেছেন যেখানে দেখানো হয় রাষ্ট্রশক্তি কিভাবে দূর্বল নাগরিককে ধ্বংস করে দেয়।

গল্পটা কাশ্মীরের। রাষ্ট্র যেখানে নাগরিকের জান কবচ করে। রিজওয়ানের বাবাকে হত্যা করে, বোন কে ধর্ষনের পর হত্যা করে, সব শেষে রাষ্ট্র তার তামাশার চুড়ান্ত রুপ দেখায় এই বলে যে, তুমি নিজেই তোমার পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছো। সুতরাং তোমাকে শাস্তি স্বরুপ মেরে ফেলা হবে।

এবং রাষ্ট্র ন্যায়ের প্রতীক হয়ে রিজওয়ানকে হত্যা করে।

কেউ মারা গেলে ছোটবেলায় আমার আম্মা আকাশের দিকে নির্দেশ করে বলতো, "আল্লায় নিয়া গেছে"! ফলে আমাদের শিশুমনে মৃত্যূর সাথে আকাশের একটা যোগসুত্র তৈরি হয়ে গেছিলো। আমার মনে হয় বেশীর ভাগ বাঙালী শিশুই এই ইমেজ নিয়ে বড় হয়েছে। আমি জানিনা জামিল আহমেদ তার শিশুবেলায় এই গল্প শুনেছেন কিনা। কিন্তু আমার বিশ্বাস শুনেছেন এবং সেই ইমেজ এখনো তার মনে গেঁথে আছে।

সেই কারনেই কিনা জানিনা "বিরাট শিশু" জামিল আহমেদ মৃতদের জগত বানিয়েছেন আকাশে। মৃত্যুর পর রিজওয়ান যখন আকাশের দিকে উঠে যায়, সপ্ত আকাশের প্রথম আকাশে দেখা হয় বোনের সঙ্গে। রিজওয়ান ছিলো পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য যে পৃথিবীতে অপেক্ষায় ছিলো এই আশায় যে তার বাবা একদিন ফিরে আসবে।

মৃত বোনের সাথে সাক্ষাতে রিজওয়ান যখন বলে উঠে "বোন, বাবাকে বলো না আমি মারা গেছি, আমাকেও বলো না বাবা মারা গেছে", তখন আমার গলা পর্যন্ত কান্না এসে ভর করে, আমি অসহায় হয়ে যাই।

এই অসহায়ত্বের ভার নিতে চাইলে শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে থিয়েটারটা দেখে আসেন। টেকনিক্যাল দিক নিয়ে কিছু বললাম না। শুধু বলবো আপনার জন্য ম্যাজিক অপেক্ষা করছে।
দেখে আসুন। ডুবে যান, ঝিলের জলে, কবিতার ঝিলে।’

আগা শহীদ আলীর কাব্যগ্রন্থ আ কান্ট্রি উইদাউট আ পোস্ট অফিস অবলম্বনে ভারতের অভিষেক মজুমদারের ইংরেজি-হিন্দি-উর্দু ভাষায় রচিত নাট্য-আখ্যান রিজওয়ান প্রদর্শিত হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটারে।

২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া নাট্য উৎসবটি চলবে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।  টানা ১০ দিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে এটির ১৯টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

আপনার মন্তব্য