নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

rohinga are comming in Bangladesh
ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গা বলেছেন, রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সেনা-পুলিশ ‘দেখলেই গুলি করছে’। আর এ ঘটনায় ফের দলে দলে বাংলাদেশের পথে ছুটছেন রোহিঙ্গারা। সীমান্তের ১৮ পয়েন্টে যেন বানের স্রোতের মতো অনুপ্রবেশ করছেন তারা। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র শত চেষ্টায়ও অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না।

যদিও বিজিবি’র পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ হচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বাস্তবে শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। শনিবার সন্ধ্যায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম তমব্রু সীমান্তের দুইটি পয়েন্ট দিয়ে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেন।

মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করা কিছু রোহিঙ্গা জানান, ২৬ আগস্ট ২০১৭ শনিবার দুপুরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়া এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামগুলোতে একযোগে তাণ্ডব চালায় সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থানীয় রাখাইনরা। এতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষ হতাহত হন।

আর এর ফলেই প্রাণ বাঁচাতে বিকালের পর থেকে সীমান্তের দীর্ঘ প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে চেষ্টা চালান। বিজিবিসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে রীতিমত হিমশিম খেতে দেখা গেছে।

উখিয়ার রহমতেরবিল ও ধামনখালী সীমান্তে দেখা গেছে, বিজিবি’র কড়া নজরদারি সত্ত্বেও নৌকা নিয়ে নারী, শিশুরা অনুপ্রবেশ করছেন বাংলাদেশে। ছোট ছোট নৌকায় করে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। এছাড়াও বালুখালী কাটা পাহাড়, ধামনখালী, আন্জুমানপাড়া এবং টেকনাফের উলুবনিয়াসহ ১৮টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন।

ঘুমধুম সীমান্তে স্থানীয় নুরুল ইসলামের বাগানে প্রায় দুই হাজারের মতো রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। ওই এলাকা থেকে মিয়ানমার সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১৫০ গজের মতো। একইভাবে কয়েকশ গজ দূরে তুম্ব্রু পশ্চিম পাড়ে পাহাড়ের ঢালে অবস্থান নিতে দেখা গেছে আরও প্রায় হাজার দেড়েক রোহিঙ্গাকে। সীমান্তের আমতলী পাহাড়ি এলাকা দিয়েও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য জড়ো হচ্ছেন। সেখান থেকে অনেকে অটোরিক্সা, ইজিবাইক ও অন্যান্য যানবাহনে করে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।

উখিয়ার রহমতেরবিল, ধামনখালী ও আনজুমানপাড়া নাফ নদী সংলগ্ন চিংড়ি ঘেরগুলোতে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় তিন হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এদের সবাই সীমান্ত সংলগ্ন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর বাসিন্দা।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খান বলেন, সীমান্তে কোনও রোহিঙ্গাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের রাতের মধ্যে ফেরত পাঠানো হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোক্তার হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাখাইনের মংডুর মেদি এলাকায় নিজের বাড়ি সামনে তাকে গুলি করা হয়।

এরপর পালিয়ে ঘন জঙ্গলে ঢুকে রাতভর হেঁটে শুক্রবার গভীর রাতে টেকনাফের উনছি প্রাং এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তার সঙ্গে গুলিবিদ্ধ আরও দুজন ছিলেন।

তিনজনকেই প্রথমে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মেডিসিন স্যঁ ফ্রঁতিয়ে (এমএসএফ) হাসপাতলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সেখান থেকে শনিবার সকালে মোক্তারের সঙ্গে মুছা নামে আরেকজনকে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে আনা হয়। এর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে মুছার মৃত্যু হয়।

মোক্তার বলেন, “মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে পুলিশ ও সেনাবহিনী যাকে পারছে তাকেই গুলি করছে। বাড়ির সামনেই আমার বাম কাঁধের উপরের অংশে গুলি লাগে। পুলিশ ও মগরাই (রাখাইন বৌদ্ধ) গুলি করেছে।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা-ইয়াঙ্গুন সম্পর্কে আস্থার অভাব বাড়ছে। মিয়ানমার সরকার তাদের দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সন্ত্রাসী হামলাকারীদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত অং মিন্টকে তলব করে এর কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

পাশাপাশি রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত করার জন্যও মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

আপনার মন্তব্য